[অপ্রকাশিত ডায়েরি] তাজউদ্দীন আহমদ: জুলাই ১৯৫৪

0
384

বিকেল ৪টায় বের হয়ে সোজা সার্টিফিকেট অফিসে গেলাম এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম যে, ১৯৪৮-৪৯ সালের সেইল ট্যাক্সের ওপর ভিত্তি করে আমাকে সার্টিফিকেট নোটিশটি দেয়া হয়েছে। প্রায় ১০ মিনিট পর এখান থেকে বের হলাম। সার্টিফিকেট অফিস থেকে বের হওয়া মাত্রই এসডিও (উত্তর)-এর অফিসের পোর্টিকোর সামনে কালীগঞ্জের মোসলেহ উদ্দীনের দেখা পেলাম। সে রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত সারা পথ তার স্বভাবজাত বাকপটুতা অনুযায়ী কথা বলেই চলল এবং রেলওয়ে স্টলে আমাকে এক কাপ চা খাওয়াল।

সোমবার, ১২ জুলাই, ১৯৫৪
ভোর সাড়ে ৫টায় উঠেছি। সকাল আটটার দিকে মৈশনের আরজু মিয়া সাহেব আরেকজন বৃদ্ধ মানুষকে নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনির্ধারিত কিছু কথাবার্তার পর সাড়ে ৮টার দিকে চলে গেলেন। সকাল ৯টার দিকে আমি ৫৫, গোয়ালনগরের মফিজউদ্দীন ভূঁইয়ার কাছে গেলাম। আমার সার্টিফিকেট নোটিশের ব্যাপারে আলোচনা করলাম। সাড়ে ১০টার দিকে এখান থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরলাম। দুপুর ১২টার দিকে সাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয় অফিসে গেলাম এবং প্রথম কিস্তির বেতন দিলাম।

ফেরার সময় কিছুক্ষণের জন্য ফজলুল হক মুসলিম হল অফিসে থেমে, বেলা প্রায় ১টা পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। বৃষ্টির কারণে অফিসের রাকিব সাহেব প্রমুখের সঙ্গে কথা বলে বাসায় ফিরি ১টা ১০ মিনিটের দিকে। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে বের হলাম। বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে রাত ৮টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করেছি। বৃষ্টির জন্য নিমতলী লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে একটা রেস্তোরাঁতে রাত সোয়া ৯টা পর্যন্ত আটকে থাকলাম। এবং বৃষ্টির মধ্যেই ১০টার দিকে বাসায় ফিরলাম। বাসায় পৌঁছে পাবুরের আসাদুল্লাহ সরকার সাহেবকে পেলাম।

তিনি রাত প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওয়ার্ড ডিভিশন সম্পর্কে কথা বললেন। রাত সাড়ে ১১টায় ঘুমাতে গেলাম। আবহাওয়া: বৃষ্টি প্রায় সারাদিন বিরতিহীনভাবে ছিল। বিশেষ করে দিনের মধ্যভাগ থেকে রাত পর্যন্ত। রাত সোয়া ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বেশ ভারি বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিময় আবহাওয়া চলছে। বাতাসে আর্দ্রতা।

মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ১৯৫৪
সকাল সোয়া ৭টায় বের হলাম। সোজা ৫৫, গোয়ালনগরে মফিজউদ্দীন ভূঁইয়ার কাছে গেলাম। ইনকাম ট্যাক্স-কাম-সেলস ট্যাক্স অফিসার ঢাকা-কে সম্বোধন করে একটা দরখাস্তের খসড়া করে তা টাইপ করলাম। মফিজউদ্দীন সাহেব দরখাস্তটি নিলেন এবং কথা দিলেন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় যা কিছু করার তা তিনি করবেন। ফকির মান্নান সাহেবের অংশীদার, ‘সুলভ প্রেসে’র ব্যবস্থাপক ফকির মান্নান সাহেবের কথা তুললেন।

তখন আমি বিশেষভাবে ফকির মান্নান সাহেব সম্পর্কে কথা বললাম। সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে উঠে পড়লাম এবং সোজা বাসায় ফিরলাম। বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে রাত ৮টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ক্লাসে উপস্থিত ছিলাম। এরপর সোজা বাসায় ফিরলাম। বিছানা: রাত ১০টায় ঘুমাতে গেলাম। আবহাওয়া: সারাদিন এবং রাত মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। দিনের শুরুতে এবং রাতের প্রথম ভাগে হালকা প্রকৃতির বৃষ্টি ছিল। সুন্দর বাতাসসহ গরম ও স্যাঁতস্যাঁতে, আর্দ্র দিন। রাত বাতাসসহ সহনীয়।

বুধবার, ১৪ জুলাই, ১৯৫৪
সকাল ৮টায় উঠেছি। বিকেল ৪টায় বের হয়ে সোজা সার্টিফিকেট অফিসে গেলাম এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম যে, ১৯৪৮-৪৯ সালের সেইল ট্যাক্সের ওপর ভিত্তি করে আমাকে সার্টিফিকেট নোটিশটি দেয়া হয়েছে। প্রায় ১০ মিনিট পর এখান থেকে বের হলাম। সার্টিফিকেট অফিস থেকে বের হওয়া মাত্রই এসডিও (উত্তর)-এর অফিসের পোর্টিকোর সামনে কালীগঞ্জের মোসলেহ উদ্দীনের দেখা পেলাম।

সে রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত সারা পথ তার স্বভাবজাত বাকপটুতা অনুযায়ী কথা বলেই চলল এবং রেলওয়ে স্টলে আমাকে এক কাপ চা খাওয়াল। এরপর বিকেল ৫টার দিকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে চলে এলাম। ফজলুল হক মুসলিম হলে আজিজ ও মাহতাবউদ্দীনের সঙ্গে তাদের রুম এন-১২তে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ছিলাম। আজিজ আমাকে মতির মিষ্টি খেতে দিল। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট থেকে ৮টা ১০ মিনিট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দুটি ক্লাস করলাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে রাত সাড়ে ৮টার দিকে সাদির মোক্তারের বাসায় তার সঙ্গে দেখা করলাম।

বারু ও হাইলজোরের জনগণের মামলার বিষয়ে কথা বললাম। সাদির মিয়া আমাকে উপরে নিয়ে গেলেন এবং চরসিন্দুরের ইয়াকুব মিয়ার বিয়েতে আড়ালের তালই সাহেব কী ভূমিকা পালন করেছেন, সে বিষয়ে কথা বললেন। সাদির মিয়া জানাল যে, মফিজ উদ্দীন খান তাকে বলেছেন এ বিষয়ে তালই সাহেবের ভূমিকা ছিল আক্রমণাত্মক, এমন যে তিনি আমাকে ইয়াকুব মিয়ার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। আমি সাদির মিয়াকে বললাম, প্রকৃতপক্ষে এমন কাজটা করার আগে তালই সাহেব আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলেননি।

রাত সোয়া ১০টার দিকে এখান থেকে বের হয়ে সোজা বাসায় ফিরলাম। সভাপতি ইউনিয়ন বোর্ড সাহিব আলী বেপারি সকালের ট্রেনে এসেছে। রাতে লতিফপুরের হোসেন মাস্টার, নায়েব আলী সরকার, আইসালি এবং অন্যান্য আরও কিছু লোক যাদের মধ্যে মোহর আলী প্রমুখ এলো এবং তারা সবাই রাতে আমাদের বাসায় রইল। রাত ১টায় ঘুমাতে গেলাম। নায়েব আলী সরকার পৌঁছানোর পরই আমাকে জানালো, গত বৃহস্পতিবারের আগের রাতে একজন দারোগা’র (ওসি নয়) সঙ্গে ঘাগটিয়ার একজন দফাদার, দুজন চৌকিদার ও সফিউদ্দিন দফাদার আইসালিকে তার শোবার ঘর থেকে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট দেখিয়ে ধরে এবং ৭০ টাকা আদায় করে।

সফিউদ্দীন দফাদার এই টাকা তার নিজ বাড়িতে বসে নিয়েছে। সে আরও ঠিক করেছে, আইসালির বাবার উপর চাপ প্রয়োগ করে সে আইস আলির ২ বিঘা জমি কিনবে। আবহাওয়া: মধ্যদিনে ও রাত সোয়া ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছাড়া বাস্তবিক অর্থে সারাদিন কোনো বৃষ্টি ছিল না। মধ্যদিন থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আবহাওয়া খুব পরিষ্কার ছিল। ৮টার দিকে হঠাৎ মেঘের আনাগোনা শুরু হয় আকাশে। আর্দ্র আবহাওয়া এবং আগের মতোই বাতাসের সঙ্গে সহনীয় রাত।

(‘সাপ্তাহিক’) – ভূমিকা ও গ্রন্থনা : সিমিন হোসেন রিমি