বুঝ হওয়ার পর থেকেই ঈদের দিনটায় দেখতাম বাবা জেলখানায়- সিমিন হোসেন রিমি

0
543

ঈদের দিন বাবার সঙ্গে দেখা হতো জেলখানায়

বুঝ হওয়ার পর থেকেই ঈদের দিনটায় দেখতাম বাবা জেলখানায় বলেছেন সিমিন হোসেন রিমি সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হতো আমাদের। ঈদে দিনে বাবার সঙ্গে দেখা করতে ময়মনসিংহ যেতাম তখন একটা ঈদ ঈদ ভাব কাজ করতো মনে। যেমন ভালো খাবার দাবার, সবাই একটু খুশি খুশি মেজাজ। ট্রেনে যেতাম। ফুলবাড়ীয়া ষ্টেশন থেকে তখন ট্রেন ছাড়তো।

১৯৬৯ সালের ঈদের কথা আমার খেয়াল আছে। সম্ভবত সেবার ঈদ হয়েছিল ডিসেম্বর মাসে। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। বাবা সেবার রাজনীতি নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, ঈদে বাবার দেখাই আমরা পাই নাই।সিমিন হোসেন রিমি

১৯৭০ সালে বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। বাবা তখন বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত। দিন রাত দৌড়াচ্ছেন। সঙ্গে আরো নেতাকর্মীরা আছেন। নিজের হাতে লাশ তোলাসহ সব কাজ করছেন। বড় নেতাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি দীর্ঘদিন উপকূলীয় এলাকাগুলোতে কাজ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও আমরা বাবাকে দেখিনি।

তারপর আসলো ১৯৭১ সাল। সে বছর ঈদ হয়েছিল নভেম্বর মাসে। আপনারা জানেন, বাবা একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন দেশ যতোদিন স্বাধীন না হয় ততোদিন তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকবেন না। তখন তিনি অন্য অনেকের সঙ্গে ব্যারাকে থাকতেন। তিনি বলতেন, আমি যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী। আমি যদি স্বাভাবিক সংসার যাপন করি, তাহলে আমার যোদ্ধারা মনোবল হারাবে।

আমি অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম, বাবা রণাঙ্গনে থাকাবস্থায় যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতেন।

অন্য সবার বাবা আছে। আমাদের বাবা নেই। সবাই ঈদের দিন বাবাকে দেখবে। আমরা দেখব না। আমরা দিনের পর দিন বাবার স্নেহ বঞ্চিত। এটা নিয়ে আমাদের কোনো আক্ষেপ ছিল না। তখন আমরা ধানমন্ডির যে বাড়িটিতে থাকতাম- আমাদের আশ-পাশে যারা ছিলেন সবার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা নিজের বাড়ির মতো সেসব বাড়িতে আসা যাওয়া করতাম।

আমরা ঈদে কাপড় এখনকার মতো কিনতাম না। আম্মা কাপড় সেলাই করতেন। আমরা সেই কাপড় পড়ে ঈদ করতাম। আম্মার হাতের সেলাই এত সুন্দর ছিল যে, আমরা কখনো দর্জি দিয়ে কাপড় সেলাই করিনি।

আমরা ভাই-বোনরা প্রতি ঈদে একটা করে জামা পেতাম। কেউ না দেখার জন্য সেটা বালিশের নিচে রেখে দিতাম। সকালে মায়ের হাতে তৈরি সেমাই খেতাম।

মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম দুটো ঈদে বাবা রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে সেবারও আমরা বাবাকে পাইনি। ১৯৭৩ সালের কথা আমার মনে আছে। সেবার সম্ভবত ঈদ হয়েছিল সেপ্টেম্বরে। আম্মা তখন দেশের বাইরে ছিলেন। মহিলা পরিষদ থেকে তিনি একটা কনফারেন্সে গিয়েছিলেন। সেবার ঈদে আমরা বাবাকে পাই। ঈদের কয়েকদিন আগে বাবা আমাকে বললেন, এবার তো তোর মা নেই। সেমাই রান্না করবে কে? আমি বললাম, বাবা আমি করবো। বাবা বললেন, দেখিস অন্যদের মতো করিস না। তোর মা যেভাবে রাঁধে সেভাবেই রাধিস। তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর। আমি সেবার ঈদে সেমাই রান্না করেছিলাম। বাবা খেয়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন।

তখন ওইটুকুন বয়সে আমি শিখে গিয়েছিলাম কীভাবে বাড়ীর দায়িত্ব নিতে হয়। কীভাবে সংসার সামলাতে হয়। এখনকার সময়ে ১২ বছরের বাচ্চারা এরকম দায়িত্ব নেবে- এটা অকল্পনীয় ব্যাপার। সোহেলের (তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ) বয়স তখন মাত্র তিন বছর। আমাদের তখন চাহিদা কম ছিল। অল্পে সন্তুষ্ট থাকতাম। এখনকার মতো অস্থিরতা ছিল না। ভোগ করার যে প্রতিযোগিতা তা তখন কল্পনাও করা যেতোনা।

বাবার সঙ্গে আমাদের শেষ ঈদ ১৯৭৫ সালে। বাবা তখনো জেলখানায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে রাখা হয়েছে। আমাদের পরিবারটি তখন গৃহবন্দী। সারাক্ষণ সবকিছু নজরদারি করা হচ্ছে। আমরা একমাসের বেশি সময় গৃহবন্দী ছিলাম। ১৫ আগস্টের এক সপ্তাহ পর বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেবারও বাবাকে দেখতে আমরা জেলখানায় যাই।

আমি আমার বইতেও লিখেছি, অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি (তাজউদ্দীন আহমেদ) বলেছিলেন, আমাদেরকে সম্ভবত আর বাঁচিয়ে রাখবে না। সেজন্য তিনি কারাগারে যে ডায়েরিটা লিখেছিলেন ৫৬৭ পৃষ্টার তা মাকে যত্নে রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু পরে ডায়েরিটা আর পাওয়া যায়নি। তখনকার কারা কর্তৃপক্ষ ডায়েরিটা ফেরত দেয়নি।

১৯৭৫ এর পরের সময়গুলো ছিল খুব ভয়াবহ। বাবাকে হত্যা করার পর থেকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ আমাদের কাছে এক একটা ইতিহাস। এরপর আমরা আর কখনও ঈদ পাইনি। তখন আমাদের সংসার চলতো বাসা ভাড়ার টাকায়। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা এক পর্যায়ে বাসা ছেড়ে দিল। তাজউদ্দীন সাহেবের বাড়ি শুনলে কেউ বাসা ভাড়া নিতে চাইত না।

আমার মা ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগের কনভেনর হলেন। তখন পর্যন্ত চার জনের বেশি লোক একসঙ্গে বনানী কবরস্থানে (যেখানে বাবাকে কবর দেওয়া হয়েছে) যেতে দেওয়া হতো না। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বনানী কবরস্থানে পাহারা ছিল।

লেখক: সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সন্তান।

অনুলিখন: আলী আদনান