তাজউদ্দীন আহমদের বয়ানে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো সেই দিন!

0
381

১০ এপ্রিল, ১৯৭১, রাতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বেতারে বক্তব্য রাখেন তাজউদ্দীন আহমদ। পরদিন আকাশবাণী থেকে আবার এই বক্তৃতা প্রচারিত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের ভিত্তি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, যা ১০ এপ্রিল ১৯৭১-এ গৃহীত হয়। এই সরকারের অধীনেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। এই সরকারকে দায়িত্ব পালন করতে হয় বিশ্ব কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক আবহকে প্রতি মুহূর্তের বিশ্নেষণ ও বিবেচনায় রেখে। সংগঠিত করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের সব বিষয়কে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র, রসদ, টাকা-পয়সার সংস্থান এবং আশ্রয়হীন প্রায় এক কোটি মানুষের দেখাশোনা। মোকাবেলা করতে হয় অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক নানামুখী ষড়যন্ত্র। এসব কর্মযজ্ঞ পালনের মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ অপর তিন জাতীয় নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার পর আজিজ বাগমারের কাছে সেই দিনগুলোর কথা ব্যক্ত করেন। আজিজ বাগমারের সেই শ্রুতিলিখন পরবর্তীকালে ‘তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি’ গ্রন্থে প্রকাশ হয়। তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন- ২৫ মার্চ ১৯৭১, স্থান ৭৫১, সাতমসজিদ রোড ধানমণ্ডি। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ছিল রাত ১১টার আগেই নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে যাব এবং নির্ধারিত গন্তব্যস্থানের উদ্দেশে রওনা দেব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। … আমি মন ঠিক করে ফেলেছি- যেতে আমাকে হবেই। বাংলাদেশ ও জাতির এই চরম দুর্যোগের মোকাবেলা করতেই হবে। আমি বেরিয়ে পড়ব, এমন সময় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এবং ড. কামাল হোসেন এলেন। কয়েক মিনিট কথা বলে আমরা তিনজন একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। …গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। ড. কামাল ধানমণ্ডিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমে গেলেন। আমীর-উল ইসলাম এবং আমি পিলখানার দিকে কিছু এগিয়ে আবার ঘুরে উত্তরে লালমাটিয়ার দিকে পৌঁছেই দেখতে পেলাম মোহাম্মদপুর এবং সেকেন্ড ক্যাপিটালের (বর্তমান শেরেবাংলানগর) দিক দিয়ে পাবিস্তানি সেনাবাহিনী এগিয়ে আসছে। …পথের পাশেই পরিচিত প্রকৌশলী আবদুল গফুরের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। এই বাড়ির পাশেই ছিল সংগ্রাম পরিষদের দপ্তর। ছেলেদেরকে ডেকে পতাকা নামিয়ে অফিস বন্ধ করে দিতে বললাম। তাদেরকে বললাম, সেনাবাহিনী আসছে, সংগ্রাম পরিষদের অফিস বুঝতে পারলে সব শেষ করে দেবে। প্রতিরোধ করার মতো শক্তি আমাদের হাতে নেই।

এদিকে চারদিক থেকে ভয়াবহ শব্দে আমার ধারণা হলো, সামরিক বাহিনী আগামীকাল নদীর ঘাটে, স্টেশনে অনেক লোক মারবে। কারণ শহর ছেড়ে যেতে হলে ওই দুটি পথেরই আশ্রয় নিতে হয়। … আমরা ঠিক করলাম আমাদের দু’জনের নাম পাল্টে ফেলব- আমার নাম মোজাফ্‌ফর হোসেন এবং আমীর-উল ইসলামের নাম রহমত আলী। …সারারাত গুলির শব্দ শুনলাম এবং আগুনের লেলিহান শিখা প্রত্যক্ষ করলাম। ২৬ মার্চ ভোর হলো। বাড়ির ভেতর থেকে লালমাটিয়ার পানির ট্যাঙ্ক দেখা যায়। সেনাবাহিনীর একটি দল এগিয়ে গেলো ট্যাঙ্কের কাছে। দারোয়ানকে ধরে এনে বেদম পেটাতে লাগল। সারাটা দিন শোনা গেল প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। … ২৭ মার্চ ভোরবেলা কারফিউর ভেতরেই প্রাচীর টপকে রওনা হলাম। একবার ভাবলাম, পাশের মসজিদে আশ্রয় নিই। কিন্তু সেখানে অবাঙালিদের আনাগোনা। এর পর আতাউল হক সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। এই বাড়ির সামনে ছিল বস্তি। দেখলাম, মুখে রুমাল বেঁধে বস্তির প্রতিটি ঘরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। আগুনের উত্তাপ সহ্য না করতে পেরে বস্তির আবালবৃদ্ধবনিতা যখন খুপরিগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল, ঠিক তখন পৃথিবীর সমস্ত বর্বরতাকে ম্লান করে দিয়ে নিরীহ নিরপরাধ মানব সন্তানদের ওপর মেশিনগানের বুলেটবৃষ্টি শুরু হলো। তাদের অসহায় চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল। সেই মুহূর্তে আমার মুখ থেকে একটি শব্দই বেরিয়েছে- ‘এরা হারবে।’ ঢাকা বেতারের ঘোষণায় শুনলাম, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে কারফিউ প্রত্যাহার করা হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম, যে করে হোক সাতমসজিদ রোড পার হয়ে রায়েরবাজার দিয়ে শহর ছেড়ে যেতে হবে। … এই সময় একবার ভেবেছিলাম, বাড়িটা দেখে গেলে কেমন হয়? বেঁচে আছে, কি মরে গেছে- সেটা অন্তত জানা যাবে। কিন্তু আবার সিদ্ধান্ত নিলাম, হয়তো শেষ মুহূর্তের দুর্বলতায় ইতিহাসের গতিধারা পাল্টে যেতে পারে। … শহরের অসংখ্য মানুষ গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা এসে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করল। হাঁটার সুবিধার জন্য পালবাড়ির ছেলেরা ১ জোড়া নতুন পাম্প শু দিল। সামনে নদী। …নদী পার হয়ে আটির বাজারে পৌঁছালাম। পথে বহু পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা। তাদের প্রাণঢালা যত্ন ও সম্মান সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেছি। … বাংলার মানুষের এই রূপ নিজ চোখে যারা দেখেনি তারা কোনোদিন জানবে না- বাংলার মানুষ নির্যাতিত মানুষের কত আপনজন! এখানে সিরাজের সঙ্গে দেখা। ঘর থেকে ২৫০ টাকা এনে হাতে তুলে দিয়ে বলল, নিয়ে যান; পথে প্রয়োজন হবে। সিরাজ একটি মোটরসাইকেল জোগাড় করে জনৈক মতিউর রহমানের বাসায় পৌঁছে দিল। বাবুবাজার ফাঁড়ির পুলিশ কনস্টেবল রুস্তমের সঙ্গে দেখা হলো। সে কোনোক্রমে পালিয়ে বেঁচে এসেছে। সে বলল, তার সহকর্মীরা যখন রাতের অন্ধকারে গভীর নিদ্রায় মগ্ন, তখন বর্বর সামরিক দস্যুরা ঘুমন্ত কনস্টেবলদের নির্বিচারে হত্যা করে। ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছিল যে, রুস্তম শুধু পালাতেই পেরেছিল; কোনো শব্দ করতে পারেনি। তাই হয়তো সে বেঁচে গিয়েছে। ২৮ মার্চ সকালে আবদুল আজিজ মণ্ডল মোটরসাইকেল নিয়ে এলেন। স্থানীয় এমপিএ সুবেদ আলী টিপুর বাড়িতে গেলাম। সেখানে কথাবার্তার পর বেরিয়ে জয়পাড়া পৌঁছালাম। আশরাফ আলী চৌধুরীর বাড়িতে গেলাম, সেখান থেকে পদ্মার পাড়ে। কিন্তু রূপালি পদ্মা তখন উত্তাল মূর্তি ধারণ করে লহরির পর লহরি তুলে আঘাত করছে। প্রচণ্ড ঝড়। পদ্মা পার হতে পারলাম না। তাঁতি শুকুর মিয়ার বাড়িতে রাত কাটাতে হলো। ২৯ মার্চ ১৯৭১, সকালে নৌকায় পদ্মা পাড়ি দিচ্ছি। নাড়ারটেক পৌঁছতে তিন ঘণ্টা। … এরই তিন ঘণ্টায় প্রত্যক্ষ করলাম রূপালি পদ্মার বহুমুখী প্রতিভা। ঘাটে পৌঁছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছ থেকে খবরাখবর জানলাম। …এখানে ঘোড়ায় চলাচলের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ঘোড়ায়, রিকশায় এবং পায়ে হেঁটে আমরা দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আওয়ামী লীগ কর্মী ইমাম উদ্দীনের বাড়ি পৌঁছালাম। সেখানে রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গেই সন্দেহ হলো, যদি সে এই ঘোষণার সঙ্গে সরকার গঠনের ঘোষণা প্রচার করে, তাহলে বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কারণ বিশ্ববাসী সে সরকারকে বাংলার জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে গণ্য করবে না এবং স্বীকৃতি দেবে না। কেননা, বাংলার মানুষের আস্থা আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বের ওপর; সেনাবাহিনীর কারও ওপর নয়।

এমন সময় খবর ছড়িয়ে পড়ল- কামারখালী দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা এগিয়ে আসছে। আবার পথে বেরিয়ে পড়লাম। পথে রাজবাড়ীর এসডিও শাহ মহাম্মদ ফরিদের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি খবর দিলেন- সীমান্ত ভালো আছে। … পায়ে হেঁটে কামারখালীতে পৌঁছালাম, সামনে মধুমতি নদী। বৃষ্টি পড়ছে। মেঘাচ্ছন্ন, রুদ্র মূর্তি আকাশের। আরোহী অনেক, কিন্তু নৌকা পার হতে রাজি হচ্ছে না। এক বৃদ্ধ মাঝিকে অনেক বলে-কয়ে তাকে রাজি করানো হলো। মধুমতি পার হয়ে আবার সেই পথ চলা। রাত আড়াইটায় মাগুরা পৌঁছালাম। সামনে খাল। আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ছেলেরা সযত্নে খাল পাহারা দিচ্ছে। পারাপারের ব্যবস্থা করছে এবং তল্লাশি করছে। আওয়ামী লীগ কর্মী ওয়াহেদ মিয়া আমাকে চিনে ফেলল। রাত ৩টায় খাল পার হয়ে রিকশা করে সোহরাব হোসেনের বাড়িতে গেলাম। আমাকে দেখে তিনি অবাক এবং সঙ্গে সঙ্গে উৎসাহিত হলেন। ৩০ মার্চ ১৯৭১, এবার সোহরাব হোসেনের সহযোগিতায় একটি জিপ পাওয়া গেল। পথের দু’ধারে নববসন্তের অপূর্ব শোভা। আমার অনুভূতির স্তরে স্তরে বারবার মনের কোনে উঁকি দিচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন সৃষ্টি ‘পায়ে চলার পথ’-এর কথা। এ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়। কিন্তু আমি মনে মনে বলছি, কবিগুরু- এ পথেই যে আমাদের ফিরে আসতে হবে। না হলে তুমি, এই শাশ্বত বাংলা ধরণির ধুলায় বিলীন হয়ে যাবে। সকাল সাড়ে ১০টায় ঝিনাইদহে পৌঁছে স্থানীয় সংসদ সদস্য এমএ আজিজ ও এসডিপিও মাহবুবের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা চুয়াডাঙ্গায় পৌঁছে মেজর আবু ওসমানকে সংবাদ পাঠালাম। ইতিমধ্যে সংসদ সদস্য ডা. আসহাবুল হক জোয়ারদার, আফজালুর রশীদ বাদলসহ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা সীমান্তের কাছে জীবননগর থানায় পৌঁছাই। আমীর-উল ইসলাম এবং আমার সঙ্গে এ সময় ছিলেন মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী এবং ডিপিও মাহবুব। আমরা সেখানে টঙ্গীর খালের ওপর কালভার্টের কাছে যাই। তৌফিক ও মাহবুব আমাদের খবর নিয়ে সীমান্তের ওপারে গিয়েছে। আমি ও আমীর-উল ইসলাম কালভার্টের ওপর বসে থাকি খবরের অপেক্ষায়।

আমি ভেবে নিয়েছি, সিগন্যাল যদি বাংলার স্বাধীনতার পরিপন্থী আসে, তবে ওপারে যাব না। সীমান্তের ওপারে গিয়ে জীবন বাঁচিয়ে লাভ নেই। দেশের ভেতরে থেকে যা কিছু আছে তাই নিয়ে সংগ্রাম অব্যাহত রাখব। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল- এই ন্যায়ের সংগ্রামে, বাঙালির অস্তিত্বের সংগ্রামে বিশ্ববাসীর নৈতিক সমর্থন আমরা পাবই। নানা কিছু ভাবতে ভাবতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ গাড়িচালক এসে খবর দিল, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন অফিসার এসেছেন। সেই অফিসার আমাদেরকে স্যালুট করলেন। বললেন, ডিআইজি গোলক মজুমদার সীমান্তের ওপারে অপেক্ষায় আছেন। পায়ে হেঁটে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করলাম। গোলক মজুমদার দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করে এসেছেন। আলোচনার সংকেত পাওয়া গেল।

গোলক মজুমদার আমাদেরকে দমদম বিমানবন্দরে নিয়ে গেলেন। রাত পৌনে ১২টায় দিল্লি থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কেএফ রুস্তমজী রাজা গোপাল এসে আমাদের স্বাগত জানালেন। এতদিন দাড়ি কামানো হয়নি, কাপড়-চোপড় ছেঁড়া-ময়লা। রুস্তমজী আমাদের দু’জনকে পায়জামা-পাঞ্জাবি দিলেন। সেই রাতেই আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো। ৩১ মার্চ ১৯৭১, আমরা আবার টঙ্গীর সীমান্তে গেলাম। সেখানে গোলক মজুমদার আমাকে একটি এলএমজি উপহার দিলেন। আমি সেই এলএমজি মেজর আবু ওসমানকে দিয়ে বললাম, ‘আপনি সামলাবেন এটা।’ তখনই সুবেদার মুজিবর রহমানকে এলএমজি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। সেই সময় গোলক মজুমদার আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘ইউ উইল উইন’। এর পর সাতক্ষীরা থেকে আগরতলা পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে গ্রহণ করার জন্য খবর পৌঁছে দিতে অনুরোধ করলাম। নিজে হিঙ্গলগঞ্জ, টাকি, হাসনাবাদ প্রভৃতি সীমান্ত এলাকা সফর করলাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের খোঁজে। ১ এপ্রিল রাত ২টায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হলাম। ২ এপ্রিল দিল্লিতে অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. আনিসুর রহমান, এমআর সিদ্দিকী, সিরাজুল হক প্রমুখের দেখা পেলাম। ৩ এপ্রিল রাত ১০টায় সফদর জং রোডের বাড়িতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমার দেখা হয়। এই আলোচনার আগেই সমস্ত পরিস্থিতি বিচার-বিশ্নেষণ করে সিদ্ধান্ত হয় যে, আমাদের সরকার গঠন করতে হবে। ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঐতিহাসিক বিবৃতি ও দলিল (ঘোষণাপত্র) লেখা শেষ হয়। এই লেখায় আমার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহান। পরদিন বিবৃতি ও দলিলের (ঘোষণাপত্র) বাংলা অনুবাদ করা হয়। ৮ এপ্রিল সরকার গঠন সম্পর্কিত বিবৃতি আমার কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১, আমি ও আমীর-উল ইসলাম একটি বিশেষ বিমানে সীমান্তবর্তী এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। এদিন জনাব মনসুর আলী এবং জনাব কামারুজ্জামান কোলকাতায় এসে পৌঁছান। ১০ এপ্রিল রাতে সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সংবলিত আমার বিবৃতি বেতারযোগে প্রচারিত হয়। ১১ এপ্রিল আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত পুনঃপ্রচার করে। এদিন ময়মনসিংহের তুরা এলাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলামের খোঁজ পেলাম। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সেদিনই রাত ৮টায় আগরতলা গেলাম। আগরতলায় খন্দকার মোশতাক আহমদ, কর্নেল এমএজি ওসমানীসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকে পেলাম। আগরতলায় এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো- চুয়াডাঙ্গায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ১৪ এপ্রিল প্রকাশ্যে শপথ গ্রহণ করবেন। সেখানেই (চুয়াডাঙ্গা) রাজধানী স্থাপন করে বাংলাদেশ সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা করা হবে। আমি ঠিক করলাম, এ রাজধানীর নাম হবে মুজিবনগর। কিন্তু আমাদের একজন সহকর্মীর অসাবধানতার জন্য সেই সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে যায়। ফলে পাকিস্তান বাহিনী চুয়াডাঙ্গার সেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করে। পরে খুব গোপনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়- চুয়াডাঙ্গার পার্শ্ববর্তী মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এই বৈদ্যনাথতলার আম্রকুঞ্জে ১৭ এপ্রিল শত শত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক এবং হাজারো জনতার সামনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বক্তৃতা দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তার পর আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তৃতা করি। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিই।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সেই বেতার ভাষণের শুরু এবং শেষের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। “স্বাধীন বাংলাদেশের বীর ভাই-বোনেরা, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মুক্তিপাগল গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদেরকে আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি। … যতদিন বাংলার আকাশে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা রইবে, যতদিন বাংলার মাটিতে মানুষ থাকবে, ততদিন মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের বীর শহীদদের অমর স্মৃতি বাঙালির মানসপটে চির অম্লান থাকবে।

২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যে নর-হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন, তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আপনারা সব কালের, সব দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী মানুষের সাথে আজ একাত্ম। … পৃথিবীর কাছে আমরা ছিলাম শান্তিপ্রিয় মানুষ। বন্ধুবাৎসল্যে, মায়া ও হাসিকান্নায়, গান, সংস্কৃতি আর সৌন্দর্যের ছায়ায় গড়ে ওঠা আমরা ছিলাম পল্লী বাংলার মানুষ। পৃথিবী ভাবত, আমরাও ভাবতাম যুদ্ধ রণডঙ্কা আমাদের থেকে অনেক দূরে। কিন্তু আজ? আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে আমরা আবার প্রমাণ করেছি যে, আমরা তিতুমীর-সূর্য সেনের বংশধর। স্বাধীনতার জন্য যেমন আমরা জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রু সৈন্যদের চিরতরে হটিয়ে দিতেও আমরা সক্ষম।

শেষ অংশ- বাংলাদেশের নিরন্ন দুঃখী মানুষের জন্য রচিত হোক নতুন পৃথিবী। যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক- ক্ষুধা, রোগ, বেকারত্ব আর অজ্ঞানতার অভিশাপ থেকে মুক্তি। এই পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত হোক সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙালি ভাইবোনের সম্মিলিত মনোবল ও অসীম শক্তি। যারা আজ রক্ত দিয়ে উর্বর করেছে বাংলাদেশের মাটি, যেখানে উৎকর্ষিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন মানুষ, তাদের রক্ত আর ঘামে ভেজা মাটি থেকে গড়ে উঠুক নতুন গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা; গণমানুষের কল্যাণ, সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে লেখা হোক জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

সংসদ সদস্য; লেখক ও সমাজকর্মী
simrim_71@hotmail.com

সংগ্রহ- দৈনিক সমকাল