শারমিন আহমদ: তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা- আমি যখন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী, তখন আমাদের একটি পাঠ্যবইয়ের নাম ছিল এ নহে কাহিনী। যতদূর মনে পড়ে, বইটি ছিল বাংলা দ্রুত পঠনের। ওই বইটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল নানা বরেণ্য ও আলোকিত ব্যক্তির গল্প।

যেমন বাঙালি মুসলিম নারীশিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে শুধু নিজে শিক্ষা লাভ করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি সেই জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন পশ্চাৎপদ নারী সমাজের সম্মুখে এগিয়ে চলার দিশারি রূপে। জেরুজালেমে ক্রুসেডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী সেনাপতি সালাহ্উদ্দীন আইয়ুবী চিকিৎসকের বেশে প্রবল প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন। বিজিতদের প্রতি তাঁর মানবিক আচরণের জন্য তিনি ইউরোপে খ্যাতি লাভ করেছিলেন ‘সালাদিন দ্য গ্রেট’ রূপে।
বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম পথিকৃৎ জ্ঞানতাপস ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অসুস্থ মাকে দেখতে ঝড়-বাদলের মধ্যে নৌকা না পেয়ে সাঁতার দিয়ে উত্তাল দামোদর নদী পার হয়েছিলেন। এমন ধরনের মহানুভবতায় ভরা অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণাময় গল্পগুলো আমাদের বাল্যকালের উষালগ্নের দিনগুলোকে সমৃদ্ধ করেছিল ও ভবিষ্যতের পাথেয় হয়েছিল। শিশু-কিশোরদের চরিত্র গঠনের জন্য এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক হিসেবে এ ধরনের জীবনগাথার গুরুত্ব অপরিসীম। এ ধরনের গল্প, জীবনী ও স্মৃতিচারণা ইতিহাসের মণিমুক্তাসম উপাদান, জাতির পথনির্দেশক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘ইতিহাস সত্য প্রকাশের জন্য।’ এ কারণে ঐতিহাসিক সত্য লুকানো ইতিহাস বিকৃতিরই নামান্তর।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জন্মভূমি কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে। এ বছরের শুরুতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য পাঠ্যবই বিতরণ অনুষ্ঠানে যখন যোগদান করি, তখন আগ্রহ নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বইগুলোতে চোখ বুলাই। বইগুলোতে তাঁর জীবনী চোখে পড়েনি, তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছে অতি সংক্ষেপে। উদাহরণস্বরূপ ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের মাত্র অর্ধ প্যারার একটি লাইনে যুক্ত হয়েছে শুধু তাঁর নাম ও পদবিটি।

ওই ন্যূনতম উল্লেখ থেকে আজকের শিশু–কিশোর, তরুণ প্রজন্ম জানবে না বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর অসামান্য অবদান ও সাফল্যের কথা। তারা জানবে না যে তাজউদ্দীন আহমদের সুদক্ষ, সাহসী, দূরদর্শী ও স্বাধীনতার প্রতি আপসহীন নেতৃত্ব ছাড়া আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভবপর হতো না। স্বাধীন দেশের মাটিতে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও সসম্মানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো না, যদি না সেদিন তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের হাল না ধরতেন। একজনকে বাদ দিয়ে অপরজনের ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতার প্রেরণা, বঙ্গবন্ধুর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের গুণে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেও ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন ধারা সমুন্নত রেখে গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য তিনি আপ্রাণ সংগ্রাম করেছিলেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট এই নেতা ছিলেন স্বাধীনচেতা, নির্লোভ ও সৎ রাজনীতিবিদ। কোনো কৃতিত্বের দাবি না করে তিনি পরিণত হয়েছিলেন অনুসরণীয় এক মহৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে।

বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাণে অনন্য ভূমিকার অধিকারী এই নেতা সম্পর্কে উল্লিখিত কথাগুলো ইতিহাসে নেই। স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে নেই বা রাষ্ট্রীয় আলোচনায়, প্রতিফলনে ও উদ্‌যাপনে উল্লেখ করা হয় না সেই কিংবদন্তিতুল্য ইতিহাস। যখন একটি সেতুর নিচে আত্মগোপনরত অবস্থায় বঙ্গতাজ স্বদেশের মুক্তির জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা প্রথম চিন্তা করেন, অথবা যখন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ বাংলাদেশের গণমানুষের যুদ্ধ। বাংলাদেশ চায় না যে ভারত তার সামরিক বল দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিক। এই স্বাধীনতার যুদ্ধটি করতে হবে বাংলাদেশের মানুষকেই।

ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে।’ ঊহ্য রয়ে যায় সেই ইতিহাসও, যখন নিজ দলের ভেতরের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ সরকারবিরোধীরা স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার জন্য অপপ্রচারণা ছড়িয়েছিল—‘বঙ্গবন্ধুকে চাও নাকি স্বাধীনতা চাও? বঙ্গবন্ধুকে পেতে হলে স্বাধীনতা পাবে না আর স্বাধীনতা পেতে হলে বঙ্গবন্ধুকে পাবে না। যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে।’ তাজউদ্দীন আহমদ তাদের এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেন তাঁর আত্মপ্রত্যয়ে ভরা অঙ্গীকার বাস্তবে পরিণত করে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুকেও চাই এবং স্বাধীনতাও চাই। স্বাধীনতা এলেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাব।’

স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা আজকের তরুণেরা পাঠ্যবই থেকে এই কথাগুলো জানবে না। জাতীয় নীতি, কর্মসূচি ও আলোচনা থেকেও তারা খুঁজে পাবে না বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদকে। এর কারণ কী? কেন অনালোকিত আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরব উজ্জ্বল স্বাধীনতাযুদ্ধের পর্বটি, যা পরিচালনার নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ? এর কারণ খুঁজতে হবে নতুন প্রজন্মকেই। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এবং নিজস্ব প্রয়োজনেই একদিন খুঁজে নেবে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদকে।
পাঠ্যপুস্তকে উল্লিখিত দু–একটি শব্দের ঘের ও রাষ্ট্রে তাঁর অতিক্ষুদ্র পরিসরে অবস্থানের গণ্ডি পেরিয়ে, কেউ যদি তাঁর বিশালত্ব খুঁজতে চান, তাঁরা তাঁকে খুঁজে পাবেন বাংলাদেশের মানচিত্রে, পতাকায়, নদী-অরণ্যে, নিষ্পেষিত জনতার অটল বিদ্রোহে, শ্রান্ত মজুরের ক্লান্তি উপশমে, আর ওই বিপন্ন বালিকার ভরসার স্থলে। তাঁকে খুঁজতে গেলেই বাংলাদেশ খুঁজে পাবে নিজেকে।

Facebook Comments