নারায়ণগঞ্জ: আমার কৈশোর

131
ঢাকার পার্শ্ববর্তী অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র এবং নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জ। পৃথিবীর নানা জায়গা, নানা দেশ , আধুনিকতার সকল সুযোগ সুবিধায় পরিপূর্ণ, সাজানো গুছানো শহরগুলো নারায়ণগঞ্জের মায়া ভুলাতে পারেনি, চোখ মেললেই যেন নারায়ানগঞ্জ. নিশ্বাসেতে নারায়ানগঞ্জ এর বাতাস, চোখ বুঝলেই নারায়ানগঞ্জএর কোন এক মেঠোপথ ধরে এগিয়ে গেরস্থ ঘরের স্নেহের ছোয়া .জেলার উত্তরে নরসিংদী ও গাজীপুর জেলা, দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে ঢাকা জেলা এবং পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা জেলা। এ জেলায় বেড়ানোর জায়গাগুলো : 
হাজীগঞ্জ দূর্গ : নারায়ণগঞ্জ জেলাশহরের কিল্লারপুলে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ দুর্গ। বাংলার বারভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর কেল্লা হিসেবেও অনেকের কাছে এটি পরিচিত। নদীপথে মগ ও পর্তুগিজদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মীরজুমলার শাসনামলে এ দুর্গ নির্মিত বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। চতুর্ভুজাকৃতি এই দুর্গের প্রাচীরে রয়েছে বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাবার ফোকর।
সোনাকান্দা দুর্গ : শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত এ জলদুর্গটি। হাজীগঞ্জ দুর্গের প্রায় বিপরীত দিকেই এর অবস্থান। নদীপথে ঢাকার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলোর নিরাপত্তার জন্য মুঘল শাসকগণ কতগুলো জলদুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সোনাকান্দা দুর্গ।
বিবি মরিয়ম মসজিদ ও সমাধি : নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত এ মসজিদটি হাজীগঞ্জ মসজিদ নামেও পরিচিতি। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি শায়েস্তা খাঁ কর্তৃক ১৬৬৪-১৬৮৮ সালে নির্মিত বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। মসজিদের কাছে তাঁর কন্যা বিবি মরিয়মের সমাধি রয়েছে বলেই মসজিদটির নাম বিবি মরিয়ম মসজিদ বলে অনেকে মনে করেন।
কদমরসুল দরগা : নারায়ণগঞ্জ শহরের বিপরীত দিকে শীতলক্ষা নদীর পূর্ব পাড়ে নবীগঞ্জে অবস্থিত কদমরসুল দরগা। এখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কদম মোবারকের ছাপ সংবলিত একটি পাথর রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট অকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলি পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১৭৭৭-১৭৭৮ সালে এ সৌধটি নির্মাণ করেন। আর কদম রসুল দরগার প্রধান ফটকটি গোলাম নবীর ছেলে গোলাম মুহাম্মদ ১৮০৫-১৮০৬ সালে নির্মাণ করেন।
শীতলক্ষা নদী : নারায়ণগঞ্জের প্রধান নদী। এক সময় বিশ্বসমাদৃত বাংলাদেশের মসলিন শিল্প গড়ে উঠেছিল শীতলক্ষার দুই তীরে। এখন বিভিন্ন কলকারখানায় পরিপূর্ণ নদীর দুই পাশ। নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ নৌ ভ্রমণে ভালো লাগবে সবার।
রূপগঞ্জ জামদানি পল্লি : শীতলক্ষার তীরে রূপগঞ্জ থানার রূপসীতে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় জামদানী পল্লি। রূপসী বাজার ও এর আশপাশে শতশত জামদানি শিল্পী দিন-রাত তাঁতে বুনেন নানা রকম শৈল্পিক জামদানি। তুলনামূলক কম দামে এখান থেকে ভালো মানের জামদনি শাড়ি কেনা যায়।
মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি : নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ায় রয়েছে প্রাচীন একটি জমিদার বাড়ি। বর্তমানে এ বাড়িতে চলছে মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের কার্যক্রম। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে বিশাল আকৃতির পুকুর। প্রাচীন এ প্রাসাদটি বেশ আকর্ষণীয়। প্রায় ৯৫টি কক্ষ সংবলিত এ প্রাসাদে অতিথিশালা, নাচঘর, পূজামণ্ডপ, কাছারিঘর, আস্তাবলসহ আরো বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত।
রাসেল পার্ক : মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির পাশেই বেসরকারি একটি বনভোজন কেন্দ্র রাসেল পার্ক। নানারকম গাছ-গাছালি ছাড়াও এখানে আছে ছোট একটি চিড়িয়াখানা। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এটি।
সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের সমাধি : নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মোগড়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের সমাধি। পাথরে তৈরি এ সমাধিসৌধটি ১৪১০ সালে নির্মিত হয়। সুলতান মারা যান ১৪০২ সালে। এ সমাধিসৌধের পূর্ব পাশের ইট-নির্মিত সমাধিটি সুলতানের প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজউদ্দিনের বলে অনুমান করা হয়।
লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন : জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিত লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। বাংলার বারভূইঁয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর শাসনামলে বর্তমান সোনারগাঁও বাংলার রাজধানী ছিল। বর্তমানে এখানে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের একটি জাদুঘর ছাড়াও প্রাচীন অনেক নিদর্শন বিদ্যমান। ১৯৭৫ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর। শনিবার থেকে বুধবার প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে লোকশিল্প জাদুঘর। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা, মাঝে ১২ টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মধ্যাহ্ন বিরতি। বৃহস্পতিবার লোকশিল্প জাদুঘর বন্ধ থাকে। কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে প্রবেশমূল্য দশ টাকা।
পানাম নগর : লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গোয়ালদী গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানামনগর। প্রাচীন এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান এখানে। পানামনগরের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক পনাম পুল।
গোয়ালদী শাহী মসজিদ : পানামনগর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ঐতিহাসিক গোয়ালদী শাহী মসজিদ। ঐতিহাসিকগণের মতে মসজিদটি ১৫১৯ সালে নির্মিত। একগম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি বাইরে পোড়ামাটির অলংকরণে সমৃদ্ধ।
কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলাচল করে আসিয়ান, বন্ধন, উৎসব, সেতু, আনন্দ ইত্যাদি http://www.narayanganj.gov.bd/

পরিবহনের বাস। ঢাকার বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তান থেকে এসব বাস পাঁচ মিনিট পর পর ছেড়ে যায় নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে। ঢাকা থেকে সোনারগাঁও যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো সার্ভিস বোরাক, সোনারগাঁও ইত্যাদি। এছাড়া ঢাকা থেকে কুমিল্লা, দাউদকান্দিগামী যে কোনো বাসে উঠে মোগড়াপাড়া নেমে সহজেই আসা যায় সোনারগাঁও।