কির মজনু শাহ সেতুর ইতিহাস

ফকির মজনু শাহ সেতু, যা কাপাসিয়া উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর উপরে অবস্থিত। এটি গাজীপুর জেলার বৃহত্তম একটি সেতু।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ৯ মে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর উক্ত সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

ফকির মজনু শাহ সেতু

যাহা ৩৯০ দশমিক ৯১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ মিটার প্রস্থের, সেতুটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয় ১৫ কোটি টাকা। ২০০৫ সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেতুটি উদ্বোধন করেন। সেতুটির মাধ্যমে ঢাকা-কাপাসিয়া-টোক-মঠখোলা-ইটাখোলা-কিশোরগঞ্জ তথা বৃহত্তর সিলেটের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।

কে ছিলেন এই ফকির মজনু শাহ
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় এক বিপ্লবী সেনানীর নাম ফকির মজনু শাহ্। আধ্যাত্মিক ও সুফী সাধক ফকির মজনু শাহ্ ছিলেন, পাক ভারতে ইতিহাস খ্যাত ফকির-সন্ন্যাসি আন্দোলনের মহা নায়ক । তাঁকে কেন্দ্র করেই ১৭৬০ থেকে ১৮০০ শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৪০ বছর ব্যাপী চলে ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলন। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বৃটিশ শাসন, শোষন, বঞ্চনার বিরুদ্ধে ও পরাধিনতার শিকল ভাঙ্গার র্দূবার ও অপ্রতিরোদ্ধ জিহাদে পরিনত হয় বাংলার জনপদ।

মীর জাফর আলী খান , উমিচাঁদ, রাজা রায়র্দূলভ, রাজা রাজ বল্লভ, মহা রাজা কৃষ্ণ, জগৎ শেঠ, ইয়ার লতিফ খান, খাদেম হোসেন আর ঘসেটি বেগমদের প্রসাদ ষড়যন্ত্রে পলাশীর প্রান্তরে বাংলা, বিহার, উরিষ্যার শেষ শ্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এ জনপদের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যখন অত্যাচারের ষ্ট্রিম রোলার চালিয়ে বৃটিশ শাসন সুদৃঢ করছিল , সেই সুচনা লগ্নে প্রতিরোধের দেয়াল রচনা করেছিলেন ফকির মজনু শাহ্। ফকির মজনু শাহ্’র নেতৃত্বাধীন ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে একই সময়ে মহীশূর সুলতান হায়দার আলী, তার সুযোগ্য পুত্র টিপু সুলতান ইংরেজ বাহিনী অগ্রযাত্রা প্রতিরোধে সিংহ পুরুষের মত গর্জে উঠেছিল। পরবর্তীতে মাওলানা নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের ১৯২৫ সালে বারাসাত বিদ্রোহ ও ১৯৩১ সালে নারিকেল বাড়িয়ার বাঁশের কেল্লার প্রতিরোধ সংগ্রাম, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তার পুত্র মাওলানা নেসার উদ্দিন দুদু মিয়ার ফরায়েজি আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের মহান সিপাহী বিপ্লব এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধের রক্তাক্ত সিড়ি বেয়ে আমরা পাই মহান শ্বাধীনতা, একটি শ্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ।

মোঘল শাসনের শেষ দিকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। কালক্রমে এই সন্নাসী ও ফকিরগন কারিগর ও কৃষকে পরিনত হয়। তবে কৃষকে পরিনত হলেও ফকিরগন রঙ্গিন আলখাল্লা এবং সন্ন্যাসীরা কোপীন পরিধান করত। এই ফকির ও সন্ন্যাসীদের একটি বড় অংশ ময়মনসিংহ, ভাওয়াল পরগনা ও উত্তরবঙ্গে বসবাস শুরু করে। উত্তর বঙ্গে বসবাসকারী ‘মাদারী’ সম্প্রদায়ভূক্ত ফকিরগন কৃষি কাজের পাশাপাশি দরগাহ্ ও তীর্থ ক্ষেত্র গুলোতে দল বেধে ঘুরে বেড়াত।

১৭৫৮ সালে ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এই সন্ন্যাসী ও ফকিরদের তীর্থ ভ্রমন ও ধর্মানুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন প্রকার কর ধার্য করতে থাকে। ১৭৫৮ সাল থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত এই ৬ বছরে মুর্শিদাবাদের ক্ষমতাহীন নবাব এবং ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উৎপিড়ন, শোষনে সাধারণ কৃষক, কারিগর ও ফকির সন্ন্যাসীগন সর্বশ্বান্ত-নিঃশ্ব হয়ে পড়ে।

এ সর্ম্পকে প্রখ্যাত ইংরেজ লেখক রেজিনাল্ড রেনল্ডস লিখেছেন, ‘‘ এই ছয় বছরের দুঃশাসনে জগৎবিখ্যাত মসলিনের কারিগরদের এক তৃতীয়াংশ বনে-জঙ্গলে পলায়ন করেছিল।”

ফকির মজনু শাহ সেতু

মসলিন কাপড়ের তুলা কার্পাসের জন্য বিখ্যাত গাজীপুরের কাপাসিয়া, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনেক কৃষক, কারিগর, ফকির-সন্ন্যাসীগন ভাওয়াল ও মধূপুরের বন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। ইংরেজ শাসন ও শোষনের বিরুদ্ধে নিস্পেষিত এসব কৃষক ও কারিগরগন ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিংস এই কৃষক বিদ্রেুাহকে ‘‘ বহিরাগত ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসী ও ফকির দস্যুদের বাংলাদেশ আক্রমন” বলে অভিহিত করলেও মূলত তা ছিল কারিগররুপি ফকির সন্ন্যাসীদের বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহীরা সশস্ত্র দলে সংঘটিত হয়ে ইংরেজ বনিকদের কুঠি-কাছারী এবং এদেশীয় তাদের দোসর দালাল জমিদারদের উপর উপর্যুপরি আক্রমন চালায়। বৃটিশ লেখক উইলিয়াম হান্টার তার এক গ্রন্থে বলেন, ‘‘এই কৃষক, কারিগর, ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহে উজ্জীবিত হয়ে মোঘল সাম্রাজ্যের ধবংস প্রাপ্ত সেনাবাহিনীর বেকার ও বুভুক্ষ সৈন্যগনও বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে অংশ গ্রহন করেছিল।’’

ডব্লিউ হান্টার এবং ও’ম্যাল বলেন, ‘‘ বিদ্রোহীদের সংখ্যা এক সময় ৫০ হাজারে উন্নীত হয়েছিল।’’ ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় তাঁর, ‘‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম (পৃষ্ঠা-২৪) পুস্তকে লিখেছেন, ‘‘ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মূল নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন ফকির মজনু শাহ্ তার সহযোগি হিসাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, মুসা শাহ্, চেরাগ আলী শাহ্, সোবহান শাহ্, করিম শাহ্, মাদার বক্স, নুরুল মোহাম্মদ, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধূরানী, কৃপানাম, রামানন্দ ঘোসাই, পূতাশ্বর, অনুপম নারায়ণ, শ্রীনিবাস প্রমূখ ফকির-সন্ন্যাসী ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ।’’

১৭৬০ সালে বর্ধমান জেলার সন্ন্যাসীরা সর্ব প্রথম বৃটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ১৭৬৩ সালে বিদ্রোহী ফকি গণ বাকেরগঞ্জ এবং ঢাকার ইংরেজ কুঠি আক্রমন করে দখল করে নেয়। ১৭৬৩ সালের মার্চ মাসে বিদ্রোহীরা রাজশাহী জেলার রামপুর-বোয়ালিয়ার ইংরেজ কুঠি আক্রমন ও লুন্ঠন করে। বিদ্রোহীরা কুঠির পরিচালক বেনেট সাহেবকে বন্দি করে পাটনায় এনে হত্যা করে। ১৭৬৬ সালে ৩০ অক্টোবর ফকির সন্ন্যাসী বাহিনী ইংরেজ ক্যাপ্টেন রেনেল ও মরিসনের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে পরাজিত করে কুচবিহার দিনহাটা এলাকায় তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

১৭৬৭ সালে বিদ্রোহীরা পাটনার আশে-পাশে ইংরেজ সেনাবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। ইতিহাসবিদ সুপ্রকাশ রায় তার বিখ্যাত গ্রন্থ ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গ্রন্থে বলেন, ‘‘১৭৭০ সালের ‘মহা র্দুভিক্ষ’ বা ‘ছিয়াত্তরের মনন্তরের’ ফলে ক্ষুধার জ্বালায় বাংলাদেশের হতভাগ্য কৃষকরা বিদ্রোহী ফকির সন্ন্যাসীদের সাথে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে অংশ গ্রহন করে। ফলে ১৭৭০ থেকে ১৭৭২ সালে সমগ্র বাংলা ও বিহার অঞ্চলে ইংরেজ বিরোধী মহা বিদ্রোহের রনক্ষেত্রে পরিনত হয়।

১৭৭০ সাল থেকে ১৭৭১ সালে ফকির আন্দোলনের মহা নায়ক আধ্যাতিক ও সূফি সাধক ফকির মজনু শাহ্ সমগ্র উত্তর বঙ্গে বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর এলাকায় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ সময় বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র স্থল ছিল পাটনা ও উত্তর বঙ্গের মহাস্থান গড়। ১৭৭৩ সালের পর থেকে উত্তর বঙ্গের রংপুর জেলা ফকির সন্ন্যাসীদের আন্দোলনের প্রধান ঘাটিতে পরিনত হয়। এখান থেকে শ্বাধীনতাকামী বিদ্রোহীরা দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চলের জমিদারদের কাছারী ও ইংরেজদের নীল কুঠি গুলো আক্রমন ও লুন্ঠন করতে থাকে।

ফকির মজনু শাহ সেতু

১৭৭২ সালের ৩০ ডিসেম্ভর বিদ্রোহীরা রংপুর শহরের নিকটবর্তী শ্যামপুরে ইংরেজ সেনাপতি টমাসকে সদলবলে হত্যা করে। ১৭৭৩ সালের ১ মার্চ বিদ্রোহীরা ময়মনসিংহ জেলার মধূপুরের জঙ্গলে সশস্ত্র যুদ্ধে ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডকে পরাজিত করে তার দলবল সহ নিহত করে।

১৭৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্ভর বগুড়া জেলার কালেশ্বর নামক স্থানে ইংরেজদের সাথে সন্মূখ যুদ্ধে ফকির মজনু শাহ্ আহত হন। কিন্তু মজনু শাহ্ আহত হয়েছেন-এ সংবাদ গোপন রাখা হয়। অতঃপর ১৭৮৭ সালে গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বিনা চিকিৎসায় ‘ফকির মজনু শাহ্’ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আপোষহীন ও বিপ্লবী নেতা আধ্যাতিক ও সূফি সাধক ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলনের বীর সেনানী ইংরেজদের মহা আতংক ফকির মজনু শাহ্ এর বর্নাঢ্য সংগ্রামী জীবন অবসানের পর তার সুযোগ্য শিষ্যগণ ১৮০০ সাল পর্যন্ত বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন তথা বিদ্রোহের আগুন অব্যাহত রাখেন।

ফকির মজনু শাহ সেতু

ফকির মজনু শাহ্’র জন্ম স্থান নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও তার আন্দোলনের প্রধান ঘাটি ছিল বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর এবং ভাওয়াল ও মধূপুর গড়। এসব অঞ্চল এখনও তার আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে আছে। তার আন্দোলন ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক। বৃটিশদের বিরুদ্ধে যখন কেউ কথা বলতে সাহস পায়নি, তখনই তিনি সিংহের মত গর্জে উঠে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মহা প্রতিরোধ রচনা করেছিলেন ফকির মজনু শাহ্’কে নিয়ে, তার আন্দোলন নিয়ে যতটুকু গবেষনা হওয়ার কথা তা আদো হয়নি। নতুন প্রজন্ম জানতে পারেনি এ বিপ্লবী শ্রমজীবী মানুষের সঠিক ইতিহাস।

এ ব্যাপারে আমাদের উদাসিনতা দুঃখ জনক। তার অবদানকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য তারই অধ:স্তন বংশধর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ্ এর প্রচেষ্টায় গত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে কাপাসিয়া শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ‘ফকির মজনু শাহ্’ নামে একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘ফকির মজনু শাহ্’ নামের সেতুটি উদ্বোধণ করেছিলেন। ফকির মজনু শাহ্ নামের এ সেতুর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলনের নেতা মজনু শাহ্ চির ভাস্বর হয়ে থাকবেন।

ছবি – মাসুম

তথ্য-BiggaponChannel

Facebook Comments