Bogalake - বগা লেক
বগালেক, বান্দরবান

পাহাড়ি কন্যা বান্দরবানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হননি এমন পর্যটক হয়ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভ্রমণপিপাসুরা নানা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে সুযোগ পেলেই চলে যান বান্দরবানে, আর নিজেকে হারিয়ে ফেলেন পাহাড়ি সৌন্দর্যে। তবে যারা বান্দরবানের নীলাচল, মেঘলা আর নীলগিরি ভ্রমণ করেই মনে করেন বান্দরবানের সব সৌন্দর্য দেখে ফেলেছেন তাদের বলছি, বান্দরবানের আরো ভেতরে যে কত সৌন্দর্যে মোড়ানো স্থান লুকিয়ে আছে সেটা শুধু গেলেই উপলব্ধি করতে পারবেন। তেমনি একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান বগা লেক।

এই বান্দরবানের এক রহস্যময় ও আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হচ্ছে বগালেক। রহস্যময় বলছি এই কারণে যে, বগালেকের উৎপত্তি নিয়ে আছে নানারকম উপকথা, যা সেখানে গেলেই শুনতে পারবেন আদিবাসীদের মুখে মুখে। প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এখানে পাহাড়ের উপর জলরাশি সঞ্চার করে তৈরি করেছে বগালেক বা বগা কানাই হ্রদ; যা বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার কেওক্রাডং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। সমুদ্র সমতল হতে প্রায় ১৭০০ ফিট উপরে পাহাড় চূড়ায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই অত্যাশ্চর্য হ্রদটি। এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। বগালেকের গড় গভীরতা আনুমানিক ১৫০ ফুটের মত। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি হ্রদ।

অদ্ভুত সুন্দর এই স্বচ্ছ পানির লেকের পাশের গ্রামটি হচ্ছে স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের বগামুখপাড়া। ভূ-তত্ত্ববিদগনের মতে, মৃত কোন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ অথবা উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে এই লেক তৈরি হয়েছে। বগালেক অনেকের কাছে ড্রাগন লেক বলে পরিচিত। এর সৃষ্টি যতটা না অবশ্বাস্য, যতটা না অলৈাকিক তার চাইতেও বেশী এর সৌন্দর্য। শান্তজলের হ্রদ আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল নিয়ে নিজেও ধারণ করে নিয়েছে সেই বর্ণীল রং। পাহাড়ের চূড়ায় নীল জলের আস্তর নীল আকাশের সাথে মিশে তৈরি করেছে এক প্রাকৃতিক কোলাজ। মুগ্ধ হয়ে দেখবেন আকাশ, পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। যেন তুলির আঁচড়ে বগালেকের পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙে আর প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এঁকেছে জলছবি।

বগালেক দুইভাবে সমাদৃত ভ্রমণপিপাসুদের কাছে। বগালেক গন্তব্য হিসেবে যেমন জনপ্রিয় আবার বগালেক পর্বতারোহীদের কাছে অনেকটাই বেস ক্যাম্পের মত যারা রুমা হয়ে ট্রেকিং রুটগুলোতে যান। বর্ষায় বগালেক ভ্রমণ করা বেশ কষ্টসাধ্য তাই শীতকালে বগালেকে যাওয়া সুবিধাজনক। তবে আপনি যদি এডভেঞ্চার প্রিয় হয়ে থাকেন এবং পাহাড়ের সত্যিকার সৌন্দর্য দেখতে চান তাহলে বর্ষায় কিংবা বর্ষার পরপরই বগালেকে যেতে পারেন। বান্দরবান থেকে বগালেক আসার পুরোটা পথ আঁকাবাঁকা পাহাড়ের পথ। এই পথের সৌন্দর্য আপনাকে আকৃষ্ট করবে, ভ্রমণের ক্লান্তি নিমিষেই চলে যাবে।

বগালেকের আশেপাশে কোন পানির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই লেকের পানি প্রতিবছর এপ্রিল থেকে মে মাসে ঘোলাটে হয়ে যায়। কারণ হিসেবে মনে করা হয়, লেকের তলদেশে একটি উষ্ণ প্রসবন রয়েছে। এই প্রসবন থেকে পানি বের হওয়ার সময় বগা লেকের পানির রঙ বদলে যায়। প্রচুর মাছে ভরা এই লেক। জলজ লতাপাতা আর খারা পাথরের পাড়ের জন্য চমৎকার তাপমাত্রার এই পানিতে সাঁতার কাটার সময় সর্তকতা অবলম্বন করবেন।

সকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত, প্রতি বেলাতেই বগালেক নতুন রূপে ধরা দেয় দর্শনার্থীদের কাছে। সকালের উজ্জ্বল আলো যেমন বগালেককে দেয় স্নিগ্ধ সতেজ রূপ, ঠিক তেমনি রাতের বেলায় দেখতে পাবেন ভিন্ন এক মায়াবী হাতছানি। রাতের বগালেক দিনের বগালেক হতে একেবারেই আলাদা। রাতটি হয় চাঁদনী রাত তবে এটি হতে পারে আপনার জীবনের অনিন্দ্য সুন্দর একটি রাত। নিকষকালো অন্ধকার রাতে পাহাড়ের বুক চিড়ে একফালি চাঁদ মৃদু আলোর ঝলক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বগালেকের শান্ত জলে। মৃদুমন্দ বাতাসে ছোট ছোট ঢেউয়ে দুলতে থাকে হ্রদের পানিতে চাঁদের ঝরে পড়া আলোকরশ্মি। নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন এমন রূপে। চারিদিক নিস্তব্ধ, নিথর, জনমানবশূন্য। সেই নির্জন নিরালায় বগালেকের পাড়ে বসে জ্যোৎস্না-স্নান শিহরণ জাগাবে আপনার অন্তরে। আর রাতটি যদি হয় অমাবস্যার তবে হারিয়ে যাবেন তারার রাজ্যে। আকাশ ভরা তারার মেলার নিচে বসে বগালেকের অপূর্ব মনোরম সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করার অনুভূতি আপনাকে নিয়ে যাবে অন্যভূবনে। যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং আপনার ভাগ্য ভাল থাকে তাহলে দেখতে পাবেন মিল্কিওয়ে। সবকিছু মিলে এ যেন এক সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

কিভাবে যাবেন বগালেক:

আপনাকে প্রথমে বান্দরবান আসতে হবে বগালেক যাবার জন্যে। দেশের যেকোন জেলা থেকেই বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল। ঢাকার কলাবাগান, সায়েদাবাদ এবং ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এর যেকোন একটি বাসে চড়ে সহজেই বান্দরবানের আসতে পারেন। এসব নন-এসি ও এসি বাসের জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৫৫০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান যেতে সময় লাগে ৮-১০ ঘণ্টা।

এছাড়া মহানগর, তূর্ণা কিংবা চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে প্রথমে চট্টগ্রামে তারপর সোজা বান্দরবানে চলে যেতে পারেন। চট্টগ্রাম শহরের বদ্দারহাট থেকেও পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের নন-এসি বাস ৩০ মিনিট পরপর বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

বান্দরবান থেকে বগালেক:

বান্দরবান শহর থেকে বগালেক যেতে হবে প্রথমে যেতে হবে রুমা বাজার। বান্দরবান থেকে রুমা বাজারের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। লোকাল বাস কিংবা চাঁন্দের গাড়ি/জীপে করে রুমা বাজার যাওয়া যায়। বাসে যেতে হলে বান্দরবানের রুমা বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বাস রুমার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দলগত ভাবে গেলে রুমা বাজার যেতে পারেন জীপ/চাঁন্দের গাড়িতে করে। এক গাড়িতে ১০-১৫ জন যাওয়া যায়। বান্দরবান শহরের জীপ স্টেশন ৩০০০-৪০০০ টাকা ভাড়ায় গাড়ি নিতে হবে। জীপে করে গেলে সময় লাগবে ২ ঘণ্টার মত।

রুমা বাজার পৌঁছে বগালেক যাবার জন্যে আপনাকে গাইড ঠিক করে নিতে হবে। গাইড নেয়া বাধ্যতামূলক। রেজিস্টার্ড গাইড আছে এমন কাউকে ঠিক করে নিতে হবে। রওনা হবার আগে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগালেক যাবার অনুমতি নিতে হবে। এই কাজ গুলো করার জন্যে গাইড আপনাকে সাহায্য করবে। আর অবশ্যই মনে রাখবেন বিকেল ৪ টার পর রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগালেক যাবার অনুমতি কিছুতেই মিলবেনা। রুমা বাজার থেকে নতুন করে জিপ/চাঁন্দের গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে হবে কমলাবাজার পর্যন্ত। তবে বর্ষাকালে প্রায়ই ভূমিধ্বসের কারণে ১১ মাইল নামক জায়গা পর্যন্ত আগানো যায় বড়জোর। তবে শুকনো মৌসুমে চাঁন্দের গাড়ি বগালেক অবধি পৌঁছায়। রুমা বাজার থেকে ১১ মাইল কিংবা কমলাবাজার পর্যন্ত রাস্তা আপনাকে ফ্রিতে রোলার কোস্টারে চড়ার স্বাদ দিবে নিশ্চিত। কমলাবাজারের পাশ থেকেই খাড়া পাহাড় উঠে গেছে আকাশপানে, এটির চূড়াতেই বগালেক। কমলাবাজার থেকে ২০-৩০ মিনিট পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে গেলেই বগালেক ধরা দিবে আপনার দৃষ্টিসীমায়। আর গাড়ি যদি ১১ মাইল পর্যন্ত যায়, সেখান থেকে হেঁটে আগে পৌঁছতে হবে কমলাবাজার, এক্ষেত্রে ট্রেকিং এ সময় লাগবে দেড়-দু ঘণ্টা।

আর যদি এডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে চান তবে রুমাবাজার হতে একটি ঝিরিপথ ধরে হেঁটে যেতে হবে বগালেক অবধি। এই পথটি দীর্ঘ আর কষ্টের কিন্তু পাহাড়ি খাল আর ঝিরিপথের রূপ বলে বোঝানোর মত নয়। যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত এবং রোমাঞ্চকর যাত্রার অনুভূতি পেতে চান কেবল তারাই এই পথে যাবার চিন্তা করবেন। তবে বৃষ্টির মৌসুমে ঝিরিপথ এড়িয়ে চলাই ভাল, ফ্ল্যাশ ফ্লাড কিংবা হড়কা বানের সম্মুখীন হবার ভয় থাকে।

রুমাবাজার থেকে বগালেক (১১ মাইল কিংবা কমলাবাজার) পর্যন্ত চাঁন্দের গাড়ির ভাড়া কমবেশি ২০০০ টাকা। তবে পর্যটন মৌসুমে তা ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর গাইডকে প্রতিদিনের জন্য দিতে হবে ৩০০-৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন:

বগালেকে উন্নতমানের কোন হোটেল বা রিসোর্ট নেই। আদিবাসীদের ছোট ছোট কিছু কটেজ আছে। আপনাকে সেই সব কটেজের কোন একটায় থাকতে হবে। একেবারে প্রাকৃতিক পরিবেশে আদিবাসীদের এই কটেজ গুলোতে থাকতে জনপ্রতি খরচ হবে ১০০-২০০ টাকা করে। এক রুমের কটেজে ৫-৬ জন থাকা যাবে। এছাড়া কাপল কিংবা মহিলাদের জন্য চাইলে আলাদা কটেজের ব্যবস্থা করা যায়।

খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা আদিবাসী ঘরেই করতে হবে। সাধারণত ১০০-২০০ টাকার খাবার প্যাকেজ পাওয়া যায়। কটেজ গুলোতে আছে বারবিকিউ করার ব্যবস্থা, পাহাড়ি মুরগি কিনে লেকের পাড়ে বসে উপভোগ করতে পারেন ভিন্ন পরিবেশের এই আয়োজন।

প্রয়োজনীয় কিছু ভ্রমণ টিপস:

১. ভাল গ্রিপের জুতা বা কেডস পড়তে হবে। ঝিরি পথ পাড়ি দিতে চাইলে প্লাস্টিকের গ্রিপওয়ালা স্যান্ডেল পড়তে হবে। অবশ্যই সাথে ব্যাগপ্যাক নেবেন এবং যথাসম্ভব কম কাপড় নেবেন। সানগ্লাস, ছাতা, পানি, মশার কয়েল/স্প্রে, প্রয়োজনীয় ফাস্ট এইড ও পাওয়ার ব্যাংক নিতে ভুলবেন না।

২. বগালেকে সব মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, শুধু রবি ও টেলিটকের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তাই সাথে করে কোন একটা সিম রাখুন।

৩. বগালেকে গোসল করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তাই লেকে গোসল করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করুন।

৪. আদিবাসী মানুষের জীবন যাত্রা সমতলের মানুষের মত নয়, তাদের অসম্মান হয় এমন কিছু করবেন না।

৫. আদিবাসীদের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

৬. নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে জাতীয় পরিচয় পত্রের কপি সাথে রাখুন

বি: দ্র: যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। মনে রাখবেন, আমাদের পরিবেশ আমাদের দায়িত্ব।

Facebook Comments