বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম!

0
103

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম!

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ- দেশপ্রেমের অনন্ত শক্তির উৎস তিনি। বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, চিন্তা-চেতনা সবকিছু ছিল মানুষকে ঘিরে। মানুষের মুক্তির চিন্তায় যেমন উদগ্রীব ছিলেন তিনি, তেমনি সমাধানের পথও খুঁজেছেন বাস্তবতার নিরিখে।

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব- সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রতীক। বিশ্বমানচিত্রে যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশের প্রতীক তিনি।বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

জাতীয় শোক দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই বাংলার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি তাঁর পরিবারের শাহাদাত বরণকারী সবাইকে।

যাকে হারানোর বেদনা অমোচনীয়, তিনি কালে কালে হয়ে ওঠেন সকল প্রেরণার উৎস। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুকে তিলে তিলে জয় করতে হয়েছিল দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর। সহ্য করতে হয়েছিল নিদারুণ নিপীড়ন। তার পরও সবকিছু সহ্য করে নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় তিনি খুঁজেছেন মানুষের সার্বিক মুক্তির পথ। তাঁর চিন্তাকে ঘিরে ছিল মানুষ, আর মানুষের কষ্ট মোচনের ভাবনা।

চিন্তা-চেতনা, সাহস ও কর্মে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য। দেশের মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য কী কী চাই তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তিনি তাঁর ‘৭০-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে ২৮ অক্টোবর ১৯৭০ সালে বেতার ও টেলিভিশনে সুদীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন।

আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো- ‘পাকিস্তানের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ এ প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যে, তারা জনগণের পাশেপাশেই থাকবে, স্বৈরাচারী ও শোষকগোষ্ঠীর মোকাবেলার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবে।

কোনো জাতি কোনোদিনই আত্মাহুতি না দিয়ে মুক্তি ও ন্যায়বিচার পায়নি। তাই আজ আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোকে জানিয়ে দিতে চায় যে, পাকিস্তানের জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের মোকাবেলা আওয়ামী লীগ অবশ্যই করবে। গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা বিঘ্নিত করা হলে আওয়ামী লীগ সব শক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই আওয়ামী লীগের জন্ম আর সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের বিকাশ।’

(তথ্যসূত্র: দৈনিক আজাদ, ২৯ অক্টোবর, ১৯৭০)

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ক্ষুুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত

উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাংলার সব মানুষকে সেই স্বপ্নের ডাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। যার ফলে জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর অনন্য নেতৃত্বের স্পর্শে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নতুন করে জেগে উঠতে থাকে। এর একটি সুন্দর বিবরণ আমরা পাই ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণে।

সেই ভাষণের অংশবিশেষ তুলে ধরছি- “উনিশ শো একাত্তর সালের এই ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি। একই দিনে আমাদের দেশ গড়ার সংগ্রাম শুরু। স্বাধীনতা সংগ্রামের চাইতেও দেশ গড়ার সংগ্রাম বেশি কঠিন। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরও ত্যাগ, আরও বেশি ধৈর্য, আরও বেশি পরিশ্রম দরকার।

…. চারদিকে এই চাই চাই আর নাই নাই-এর মধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু। উনিশ শো একাত্তর থেকে উনিশ শো তিয়াত্তর। সময়ের হিসাবে মাত্র দুই বছর। এই দু’বছরে আমরা কী পেয়েছি আর কী পাই নাই, আজ তারও খতিয়ান এবং আত্মবিশ্নেষণের দিন। আমি বড় দাবি করি না।

আমরা কোনো ভুল করি নাই

বা কোনো কাজে ত্রুটি হয় নাই- এমন কথাও বলি না। শুধু অনুরোধ করব, আপনাদের চারপাশে পৃথিবীর আরও অনেক দেশের ইতিহাসের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। আমেরিকা পৃথিবীর সবচাইতে ধনী দেশ।

এই আমেরিকাকেও স্বাধীনতা লাভের পর দুই দুইটি গৃহযুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়েছে। আজকের অবস্থায় পৌঁছাতে আমেরিকার সময় লেগেছে প্রায় এক শো বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রী অর্থনীতি গড়ে তুলতে ত্রিশ বছর প্রত্যেকটি মানুষের একটানা কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়েছে। সোভিয়েত বিপ্লবের পর প্রথম পাঁচ বছরে দুর্ভিক্ষে মারা গেছে অসংখ্য লোক। সমাজতন্ত্রের শত্রু অসংখ্য লোককে প্রাণদণ্ড দিতে হয়েছে।

নয়া চীন সমাজতন্ত্রী বিপ্লবের পঁচিশ বছর পর এখনও খাদ্যে আত্মনির্ভর হয়নি। শ্রমিকদের অল্প মজুরি এবং বছরে দুই প্রস্থ কাপড় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আমাদের প্রতিবেশী মিত্র রাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে এখনও চলছে গরিবি হটাও আন্দোলন।

…. আমি জানি না,

রক্তাক্ত বিপ্লবের পর পৃথিবীর আর কোনো দেশে সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক শাসন চালু করা হয়েছে কি-না। আমার জানামতে হয়নি। বাংলাদেশে তা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিপ্লবের এক বছরের মধ্যে সংবিধান তৈরি করেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে। ভোট দেওয়ার বয়স একুশের বদলে আঠার বছর করে ভোটাধিকারের সীমানা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান এখন উড়ছে দেশ-বিদেশের আকাশে। তৈরি হয়েছে নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজ বহর।

বিডিআর সীমান্ত পাহারায় নিযুক্ত। স্থলবাহিনী মাতৃভূমির উপর যে কোনো হামলা প্রতিরোধে প্রস্তুত। গড়ে উঠেছে আমাদের নিজস্ব নৌ ও বিমানবাহিনী। থানা ও পুলিশ সংগঠনের যে শতকরা ৭০ ভাগ পাকিস্তানি হানাদারেরা নষ্ট করেছিল, এখন আবার তা গড়ে উঠেছে। পাকিস্তানের বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ সংস্থা, এমনকি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও আমরা সদস্য। তাতেই প্রমাণিত হয়, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ আজ বাংলাদেশের পাশে।”

(সূত্র :মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা ৪৫২-৪৫৫, হারুণ-অর-রশিদ)

মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে

স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ চরম দরিদ্র দেশ থেকে স্বল্পোন্নত দেশের পথে পা বাড়াতে সক্ষম হয়। কিন্তু ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তব রূপায়ণকে স্তব্ধ করে দেয়। সত্যের জয়কে প্রলম্বিত করা যায় কিন্তু ঠেকিয়ে রাখা যায় না।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশ সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে এক বিস্ময়ের নাম। ছোট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল দেশ। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাসকরণ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ থেমে থাকার নয়।

সিমিন হোসেন রিমি- জাতীয় সংসদ সদস্য, লেখক ও সমাজকর্মী