প্রাচ্যের ভেনিস । বরিশাল । পেয়ারাবাজার

0
250

আচ্ছা ভাই বরিশালের পেয়ারাবাজার, স্বরুপকাঠি নিয়ে কিছু বলার আছে?
না ভাই কিছু বলার নাই এক শব্দে মায়াবী যাকে বলে সেটাই এটা।যে জায়গায় আপনি কক্ষনো যান নি সে জায়গা অবশ্যই ভালো লাগতে হবে। আর যদি ভালো না লাগে তাহলে কতৃপক্ষ কোন দায়ভার নিবে না।
১.
লন্চ ভ্রমন বরাবরের মতই এক্সাইটিং।পানির উপর দিয়ে চলে একটা লোহার জিনিস।যেখানে লোহার সামান্য একটা টুকরা পানিতে ঢুবে যায়,সেখানে এতবড় লোহার দানব পানিতে ভেসে চলে! চার-পাচ তলা বাড়ির সমান।ভেসে চলা বাড়ি! লিফট, এসি, বিলাসিতার কোন অভার নেই। অন্যরকম এক অনুভূতি। যদিও আমার জন্য বিলাসিতা ছিলো কখনো লন্চের সামনের দিকে দাড়িয়ে,কখনো বা কড়িডোরে পাতা চেয়ারে বসে ছুটে চলা লন্চ ও চারপাশের পরিবেশ দেখে দেখে রাত পাড় করা। কারন মুলত ডেকের টিকেট কেটেই যেতে হয়েছে। ৭ জনের টিমের জন্য একটা কেবিন অবশ্য নেওয়া হয়েছিলো। একটা কেবিন সিঙ্গেল বেড তাতে কি আর ৭ জন মানুষ সোজা হয়ে শুয়ে ঘুম দিতে পারে! তবুও ভাগাভাগি করে দফায় দফায় ঘুম হয়েছে সবার কম বেশি।
সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার ছিলো ব্যাচম্যাটদের সাথে এটা আমার প্রথম ট্যুর।

২.
বাজেট ট্যুর ছিলো যার কারনে যাওয়ার পথে ঘুমের একটু প্রবলেম হয়েছে। সারাত জেগে থেকে সারাদিন ঘুরাঘুরি! শেষ দিকটাতে ফিরতি পথ পুরোটাই কেটেছে ঘুমে ঘুমে!অবশেষ দুর্গাসাগর দীঘী তে গিয়ে সবার ঘুম ছিলো মনে রাখার মতন!সবুজে ঘেরা একটা জায়গা বিরাট এক দিঘী তার পাড়ে সুয়ে ঘুম!কি মজা!!

৩.
দুটো রোডে যাওয়া যায় আমরা গিয়েছিলাম বরিশাল-বানারীপাড়া হয়ে।এ পথটায় গেলে খরচ এবং পথ কিছুটা বেশি হয় তবে আমার মনে হয় এ পথটাই বেটার! এক বড় আলিশান লন্চে যাওয়া যায়।দ্বিতীয়ত বানারীপাড়া থেকে ট্রলারে করে একটু বেশি পথ ঘুরা যায়। যেহেতু মুল আকর্ষণ ট্রলারে করে ঘুরা। ট্রলার সন্ধ্যা নদী হয়ে আকাবাঁকা খালে প্রবেশ করার মুহূর্ত খুব দারুন লাগবে। সেই সাথে খাল সরু থেকে সরু হওয়াটাও খুব অবাককরা বিষয়। খালের উপর একটু পর পর দেখা যাবে সড়ক পথের সংয়োগ সেতু। কিংবা বাশের সাকোঁ। আর দুধারে বসতি এলাকা। দেখলাম খালের পাড়ের প্রায় মানুষেরাই খালের পানিকে খুব ভালোভাবে ব্যাবহার করছেন। হাড়ি পাতিল ধোয়াঁ থেকে শুরু করে গোসল সব খালের পানিতেই সাড়ছেন তারা।

৪.
আকা বাকা খাল যখন কুনিয়া পেয়ারাবাজারে গিয়ে থামবে দেসখানে দেখা যাবে এক অদ্ভুত ব্যাপার। নদীর উপর চলছে বেচাঁ কেনা। পাইকাররা বড় বড় ট্রলার নিয়ে অপেক্ষা করছেন স্হানীয় ছোট ছোট নৌকায় করে আসা পেয়ারা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পেয়ারা কিনে নেওয়ার জন্য। আমরা ট্রলার থেকে নেমে বাজারসহ আশেপাশে ঘুরে ফিরে দেখলাম। পেয়ারা কিনে খেলাম। খুব কম দামে না একদম! তবে ঢাকার থেকে অনেক কম দামে অনেকগুলো পেয়ারা কেনা হলো। কোনটা ভালো লাগে কোনটা পানসে! তবে বিটলবন দিয়ে খেতে ভালোই ছিলো। তবে আমি একটা কথা বলতে চাই পেয়ারা তো খেতেই হবে আর পেয়ারা বাগানেও একটু ঢুকতে হবে হেটে দেখতে হবে,গাছ থেকে ছিড়ে পেয়ারা খেতে হবে! তার জন্য আপনি যদি যাত্রা পথে কোন এক পেয়ারা বাগানে ঢুকে পেয়ারা খেয়ে নেন সেটাই ভালো হবে সবচেয়ে বেশি।তারপর যদি আপনি বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে আসতে চান তাহলে সেটা হাট থেকে কিনে নিতে পারেন।কারন আমাদের হয়েছিলো আমরা দুপুরের খাবারের পর ফিরতি পথে পেয়ারার বাগানে প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে একটা পেয়ারা পার্ক আছে। তারা বলছেন সেটা নাকি দক্ষিন এশিয়ার সবচেয়ে বড় পেয়ারা বাগান। সেখানে প্রবেশ মুল্য ৩০ টাকা জনপ্রতি। আর আপনি আপনার ইচ্ছেমতন পেয়ারা ছিড়ে খেতে পারবেন গাছ থেকে যত খুশি ততো।

এক পর্যায়ে খালের পানিতে গোসল। যদিও আমি করিনি। কারন সাতার অতোটা ভালো পারি না। আর জোয়ারের সময় থাকায় খুব স্রোত ছিলো খালের পানিতে।
অবশেষে দুপুরের খাবার খেয়ে কুনিয়া পেয়রা বাজার থেকে বানারীপাড়ে ঘাটে ফেরত আসতে আসতে মনে হচ্ছিলো খুব মায়াবতী কারো থেকে বলে কয়ে বিদায় নিয়ে নিচ্ছি! হয়তো বহু বহু বহু দিন পরে আবারো দেখা হতে পারে আবার নাও পারে। না হওয়ার সম্ভাবনাটাই সবচে বেশি! কিন্তু মনে মনে অনুভূতির চিঠি আদান প্রদান চলতে থাকবে কুনিয়া পেয়ারাবাজার এর সাথে। আকাবাকা সরু খাল। খালের দুপাড়ের মানুষের জীবন…… সুন্দর কিছু স্মৃতি।

৫.
জায়গাটার নাম ৩০ গোডাউন।এখানে একটি রিভার ভিউ পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ সৃতি স্তম্ভ রয়েছে।কীর্তণখোলা নদীর পাড়ে অবস্থিত । জোস্নাস্নাত এই জায়গাটা অত্যাধিক কিউট লাগবে।
বরিশাল ট্রিপে বাড়তি ও বোনাস হিসেবে যদি চাদঁনী রাত পেয়ে যান তাহলে তো কথাই নেই। ভালো হয় চাঁদনী রাত হিসেব করে যাবেন। আর ফিরতি পথে লন্চ ছাড়তে ৯ টা সাড়ে ৯ টা বাজবে। সন্ধ্যার সময়টুকু ঘাটের আশে পাশের মধ্যে জায়গাটা হতে পারে সময় কাটানোর জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা।

৬.
জুলাই-আগষ্ট মাস পেয়ারাবাজার ট্যুার এর সেরা সময়।

৭.
খরচ:
সদরঘাট-বরিশাল: ১৫০/২০০(ডেক) ৯০০ (সিঙ্গেল কেবিন)
বরিশাল ঘাট – নতুল্লাবাদ: ১০ টাকা(জনপ্রতি)
নতুল্লাবাদ-মহেন্দ্রাতে করে বানারীপাড়া ঘাট: ৩০০/৩৫০ টাকা রিজার্ভ(৮জন বসা যায়)
বানারীপাড়া থেকে ট্রলার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা: ১২০০ টাকা + মাঝির খাবার খরচ (অনায়াসে ১২-২৫ জন রিলাক্সে মুভমেন্ট করতে পারবেন)
পেয়ারা পার্কে প্রবেশ মুল্য: ৩০টাকা (জনপ্রতি)
দুর্গাসাগর প্রবেশ মুল্য: ২০টাকা (জনপ্রতি)
ভাড়ার ক্ষেত্রে দামাদামি করলে আরো কমাতে পারবেন হয়তো!
ফিরতি পথে আবার ঐ!

৮.
পরিবেশ নোংড়া না করার সর্বাত্বক চেষ্টা করা উচিত!
৯.
ভ্রমন হোক আনন্দময়।

Facebook Comments