বিবিসি বাংলার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জোহরা তাজউদ্দীন- ১১ই জুলাই ২০১২ সাল

193

২০১২ সালের ১১ জুলাই বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। বিবিসির হয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন ফরিদ আহমেদ। সম্ভবত এটিই গণমাধ্যমের কাছে তার শেষ সাক্ষাৎকার।
বিবিসিঃ কেমন ছিল আপনার ছেলেবেলা?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ ভালোই প্রশ্ন করেছেন। এমন কোন একটা নরমাল গতিতে আমার ছেলেবেলার দিন গুলো যায়নি। খুব এক্টিভ , দৌড়াদৌড়ি, স্পোর্টস এসবের মধ্যে ছিলাম। সব ধরনের খেলাধূলাই আমি স্পিরিট নিয়ে খেলতাম। বেশ ভালোই সুনামের সঙ্গেই খেলতাম। বেশীরভাগ সময়ই ফাস্ট হতাম। খেলা শেখার উদ্যম বড় ভাইদের কাছ থেকে এসেছে। আমি তখন প্রায় অলরাউন্ডারের মত ছিলাম। সাতার থেকে আরম্ভ করে ঘোড়দৌড়, স্লাইকিং, ব্যাডমিন্টন, পোল্ভল্ট, পোলজাম্প, এসব খেলায় আমি খুব ভালো ছিলাম। আমার বাবা ঢাকা কলেজের প্রফেসর ছিলেন। খুবই লিবারেল মাইন্ডের ছিলেন। সব দিকেই আমাদের বোনদের স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিলেন।
বিবিসিঃ আপনারা কয় ভাই বোন ছিলেন?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ তিন ভাই, দুইবোন, আমি সবার ছোট ছিলাম।
বিবিসিঃ ছোট হিসেবে কি খুব দোষ্ট চিলেন?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমাকে নাকি ১৪-১৫ বছর বয়স পর্যন্ত কেউ হাটতেই দেখেনি,দৌড় দিয়ে যেতাম। খুব তাড়াতাড়ি, প্রত্যেক জিনিস আমি দৌড়িয়ে করতাম।
বিবিসিঃ আপনার বাবা একজন অধ্যাপক ছিলেন। পরিবারের বাকি সবাই উদার, সংস্কৃতিমনা ছিলেন। আপনার ব্যাক্তি এবং শিক্ষা জীবনে তার কি প্রভাব পড়েছে?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ ব্যাক্তি এবং শিক্ষা জীবনে ওই প্রভাবতো আছেই, পড়বেই স্বাভাবিকভাবে। মানুষের সেবা করার প্রবৃত্তিটা। তার পরবর্তীকালে লেখাপড়ার সঙ্গে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতাম। ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট নিয়ে বিনা পয়সায় গরিবদের চিকিৎসা করতাম।
বিবিসিঃ আপনার বয়স যখন ২৭ তখন ১৯৫৯ সালে বাংলাদেশের প্রথম প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সাথে বিয়ে হয়। আগে কি আপনাদের জানাশোনা ছিল?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ আগে থেকে আমি তাজউদ্দীনকে নামে চিন্তাম। পরবর্তীকালে জানাশোনা হয়। পরে তার কথা বলা হলে আমি একসেপ্ট করে এগিয়েছি। তার ফ্যামিলির সবাই জানত। তিনি বলে রেখেছিলেন যে এরকম একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন। তার এক বন্ধুর বাসায়, ইসমাইল হোসেন তার নাম, তার বাসায় তিনি প্রায়ই যেতেন। ওইখানেই পরিচয় হয়, কথাবার্তা হয় আর কি। এভাবেই এগিয়েছিল।
বিবিসিঃ আমরা যতটুকু জানি, আপনি মহিলা পরিষদের নেত্রী ছিলেন, নারীমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবার ষাটের দশকে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনেও রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। এটা কি তাজউদ্দীন আহমদের প্রভাবে নাকি নিজের ইচ্ছায়?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ আমার নিজের ইচ্ছায়। আমিতো আওয়ামীলীগের ভেতরে ছিলামই। প্রফেসর বদরুন্নেসা আপা বঙ্গবন্ধুর পাশের বাসাতেই থাকতেন। তাদের সঙ্গে আমাদের খুব জানাশোনা ছিল। বদরুন্নেসা আপাকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রস্তাব পাঠালেন, আমি যেন আওয়ামীলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে যোগঈদেই। আমি রাজী হলাম। আমি তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বল্লেন, তুমি যোগ দিবে তোমার ইচ্ছায়। ব্যাক্তিগত কোন ইচ্ছার উপর তাজউদ্দীন আহমদ হস্তক্ষেপ করতেন না, চাপিয়ে ও দিতেন না।
বিবিসিঃ মুক্তিযুদ্ধে আপনার এবং আপনার পরিবারের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কোন সময়টার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ তখন তো সবসময়ই একটা জটিল অবস্থার মধ্যে ছিলাম। পার্টিকুলারলি বলে কিছু ছিল না। আমি ৪০-৪২ গ্রামে লুকিয়ে পালিয়ে ছিলাম। আমার ছোট ছেলেটা, সোহেলের বয়স ছিল এক বছর। আর মেয়ে তো তিনজন ছিল। ২৫ মার্চ রাতে আঙিনার বাইরে ঢুকে সব ভেঙেচুরে গুলি করেছে। বলেছে, কিধার হ্যায় তাজউদ্দীন, বেগম তাজউদ্দীন কিধার হ্যায়? ঠিক তার ১০ মিনিট আগে তাজউদ্দীন সাহেব বাড়ি ছাড়েন। তাকে নিতে এসেছিলেন ড. কামাল ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তারা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাজউদ্দীনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যাওয়ার সময় তিনি কিছুই বলে যেতে পারলেন না। তিনি চলে গেলেন। আমি তো হতভম্ব হয়ে গেলাম, যাওয়ার সময় কিছুই বলে গেল না! ২৬ মার্চ কারফিউ উঠে যাওয়ার পর ২৭ মার্চ তিনি আমাকে একটা চিরকুট পাঠালেন। তাতে লেখা, চলে গেলাম। আসার সময় কিছু বলে আসতে পারলাম না। ছেলেমেয়েকে নিয়ে তুমি সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে মিশে যেও। কবে দেখা হবে জানি না। দেখা হবে। তারপর বিরাট করে লেখা, মুক্তির পর। গর্বে আমার বুক ভরে গেল। আমি মানুষের সঙ্গেই মিশে গেলাম।
বিবিসিঃ ১৯৭৫ সালের যে ঘটনাবলি, প্রথমত আগস্টে এবং পরে নভেম্বরে, তা আপনার জীবনে অনেক বড় বিয়োগান্ত ঘটনা। কিন্তু আপনি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনটি মেয়ে এবং একটি ছেলে নিয়ে বহুটা পথ আপনি পাড়ি দিয়েছেন। কীভাবে?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ অত্যন্ত সাবধানে, তখন আমার প্রতিদিন কাটত। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। দিনের বেলা কোনোরকমে খবর নিতাম। এদিকে-ওদিকে থাকতাম। খোঁজ নিয়ে জানার চেষ্টা করতাম, কার কী হচ্ছে। তাজউদ্দীন সাহেব তো তখন মারাই গেছেন। ঢাকায় নানা রকমের উৎপাত। মেরে ফেলা হবে, কাউকে রাখা হবে না। শেষে বেপরোয়া হয়ে গেলাম। মেরে ফেললে কী করা যাবে, কত সাবধানে থাকা যাবে। ছেড়ে দিয়েছিলাম নিয়তির হাতে।
বিবিসিঃ ১৯৭৭ সালে আপনি আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নির্বাচিত হলেন এবং দলকে নতুন করে সংগঠিত করা শুরু করেন। কেন সেদিন দলের হাল ধরেছিলেন? কী কারণ ছিল?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ আমি ধরেছিলাম, আসলে আমাকে সবাই বলে তখন দলের আহ্বায়ক করল। এই দল যদি উঠে দাঁড়ায় তাহলেই যদি প্রতিবাদ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, এই দল দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, এই দলকে এখন এগিয়ে নিয়ে হবে; এগুলো মনে হতো। একদিন আমি স্বপ্নে দেখি, তাজউদ্দীন সাহেব আধশোয়া অবস্থায় বলছেন, তুমি মিটিংয়ে যাও না কেন? মিটিংয়ে যাও। ঠিক এই দুটি কথা। তারপরের দিন আওয়ামী লীগের মিটিং ছিল। আমি মিটিংয়ে গেলাম। মিটিংয়ের আলোচনার মূল বিষয় হলো কাউন্সিল হবে, তারিখ ঠিক করা। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের তারিখ ৫ দিন পরে ঠিক করা হলো। তখন আমরা কমিটি বসেছি আলাপ করার জন্য কে আহ্বায়ক হবে, তখন কেউ আর কাউকে মানছে না। দু′জন দু′জনকে নিয়ে গ্রুপ গ্রুপ করে পরামর্শ করছে। ঠিক করতে পারছে না কাকে করা হবে। যখন কোনোভাবেই সিদ্ধান্ত হচ্ছে না, সবাই বসে আছে, তখন আমাদের একজন নেতা জহিরুল ইসলাম সাহেব, তিনি উঠে বললেন, বেগম তাজউদ্দীনকে করা হোক। তিনি কথাটা শেষও করেননি, তখনই হাতে তালি। ওই প্রস্তাব কাউন্সিলে চলে গেল। কেউ এটাকে রদ করল না, বাধাও দিল না। তারপর আমাকে কাউন্সিলে নিয়ে গেল।
বিবিসিঃ আজকের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে দলের প্রধান করা, এসব বিষয়ে আপনার বড় ভূমিকা ছিল। আপনি নিজেই তো দলের প্রধান থাকতে পারতেন। কেন দলীয় প্রধানের পদটি ছেড়েছিলেন?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ এর ভেতরে তো অনেক কথা আছে। প্রস্তাব আসার পর ন্যাচারালি সবাইমেনে নিল। যখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নাম উত্থাপিত হলো, তখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা উপযুক্ত বলেই বিবেচিত হলো।
বিবিসিঃ আপনার কাছে কী মনে হয়, আপনি তো দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করেছেন, রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন এবং এখনও আছেন আওয়ামী লীগে। কোনটি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ কাজের মধ্য দিয়েই আমার অর্জন। যা করেছি, যা মানুষের জন্য করেছি, দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য করেছি। এটাই তো বড় অর্জন। আমার মনেপ্রাণে বিশ্বাস ছিল রাজনীতি হবে মানুষের জন্য কাজ করা। রাজনীতির একটা মোটিভ থাকবে, উপকার করা, দেশের উপকার করা। সারাজীবন এটাই মনে পোষণ করে এসেছি, এখনও করি। করি কিন্তু ওই জিনিস তো পাই না।
বিবিসিঃ আপনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? আপনি কীভাবে দেখতে চান?
জোহরা তাজউদ্দীনঃ এখন? এখন আর কীভাবে দেখতে চাইব। আমি চাই রাজনীতি আবার সুন্দর হয়ে উঠুক। সবাই দেশের জন্য ভাবুক। সত্যিকার লোক আসুক, যারা প্রতিবাদ করতে পারবে। চরিত্রবান, সত্যবাদী মানুষই কিছু করতে পারবে। আমি দেখেছি যারা কম বুঝে, কম চাহিদা তারা কিছুই করতে পারে না। তারা কাজ করতে পারে তাদের চিন্তাধারা, তাদের জ্ঞান, তাদের সীমারেখা আলাদা। সেজন্যই আমি মনে করি, চরিত্রবান লোককে দিয়েই একটা কিছু আশা করা যায়। সে নিজের জীবনের বাজি রেখে কাজ করবে দেশের জন্য। নিদর্শন তো কতই আছে।
বিবিসিঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
জোহরা তাজউদ্দীনঃ অনেক দিনের কথা আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, বলতে পেরে আমিও খুব তৃপ্তিবোধ করছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।