একাত্তরের বীর নায়ক- তাজউদ্দীন আহমদ

0
410

একাত্তরের বীর নায়ক- তাজউদ্দীন আহমদ

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর যে নামটি অনিবার্যভাবে এসে যায় তিনি তাজউদ্দীন আহমদ। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছিলেন রাজনীতি-সচেতন। শান্ত, সংযমী, মিতভাষী, দায়িত্বশীল ও স্নেহপরায়ণ এক অনন্য গুণাবলিসম্পন্ন হিসেবে শৈশব-কৈশোরে বেড়ে ওঠেন তিনি।

কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ প্রাইমারি স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মফিজউদ্দীন সাহেব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে তাজউদ্দীন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে সব শিক্ষকের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সে হলো গ্রেট স্কলার। সে হলো রত্ন। তার মাঝে আমি বিরাট ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।’
(সূত্র : স্বকৃত নোমান, তাজউদ্দীন আহমদ, পৃ. ১৮)।তাজউদ্দীন আহমদ

প্রধান শিক্ষক মফিজউদ্দীন সাহেবের সেই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়নি। ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বাংলা প্রদেশের একমাত্র বোর্ড কলিকাতা বোর্ডে তিনি ১২তম স্থান অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায়ও তিনি ঢাকা বোর্ড থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন।

মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তার কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান তাকে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয় দফা আন্দোলনে তাজউদ্দীন ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করেন শেখ মুজিবকে।

শেখ মুজিব যেদিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন, সেদিনই তাজউদ্দীন হন সাধারণ সম্পাদক। শুরু হয় বাংলার রাজনৈতিক আকাশে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন জুটির ঘনিষ্ঠভাবে পথচলা। আর এই রাজনৈতিক জুটির ঘনিষ্ঠতা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাজউদ্দীনকে ভয় পেত। ভয় পেত তার প্রখর মেধা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি এবং কৌশলকে। বস্তুত বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন ছিলেন যেন একে অন্যের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে আপন ছোট বোনের মতো স্নেহ করতেন। তাজউদ্দীনের দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের বিষয়টি বঙ্গবন্ধু ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি জোহরা তাজউদ্দীনের ডাক নাম ধরে বলতেন, ‘লিলি, তাজউদ্দীনের দিকে খেয়াল রেখো, ওকে ছাড়া কিন্তু সব অচল।’
(সূত্র : ঐ)

তাজউদ্দীন আহমদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ও অবদান মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সফল যোগাযোগের মাধ্যমে একদিকে ভারতের সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থন আদায়; অন্যদিকে মুজিবনগর সরকার গঠন। ১৭ এপ্রিল বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে গঠিত হয় সরকার। তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতিত্বের নিদর্শনস্বরূপ এই সরকারের নামকরণ করেন ‘মুজিবনগর সরকার’।

শপথ গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে আমাদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই মেহেরপুরের নাম হবে বাঙালি জাতির সর্বশেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে ‘মুজিবনগর’ এবং এই মুজিবনগর আজ থেকে হবে বাংলাদেশের রাজধানী।’
(সূত্র : স্বকৃত নোমান, তাজউদ্দীন আহমদ, পৃ. ৭০)।

এই মুজিবনগর সরকার তথা বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। আর সর্বশ্রদ্ধার আসনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে মওলানা ভাসানীরও তাজউদ্দীনের প্রতি ছিল বিশেষ স্নেহ। তাই তিনি তাজউদ্দীন সম্পর্কে বিনা দ্বিধায় বলতেন, ‘তাজউদ্দীন আমার যোগ্য ছেলে, ওর প্রতি আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’
(সূত্র : তাজউদ্দীন আহমদ, স্বকৃত নোমান, পৃ. ৭৪)।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দীন আহমদ তীব্রভাবে বঙ্গবন্ধুর অভাববোধ করতেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের উষালগ্ন থেকে একেবারে চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক সত্তা। তাদের দু’জনের সম্মিলিত প্রয়াসই অনিবার্য করে তুলেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। অথচ অগ্নিসংগ্রামের মূল নয় মাস বঙ্গবন্ধুবিহীন তাজউদ্দীনকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছিল।

একদিকে ঘরের শত্রু মোশতাক গং, অন্যদিকে পাকিস্তানসহ বহির্বিশ্ব। তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ এবং সামনে রেখে দৃপ্ত প্রত্যয়ে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিকামী জনতাকে সর্বদা সজাগ রাখতে তিনি ছিলেন সচেষ্ট। তিনি তীব্র আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতেন, বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, নয়নের মণি বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে আমরা ফিরিয়ে আনবই। তার সেই আত্মবিশ্বাস বৃথা যায়নি, এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।

যেদিন বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, সেদিন তাজউদ্দীন আহমদকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যেন বাংলার স্বাধীনতা পূর্ণতা পেয়েছিল, এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়। তাজউদ্দীন মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র আর বঙ্গবন্ধু তা গ্রহণ করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েম ছিল তাজউদ্দীনের প্রতিজ্ঞা, স্বপ্ন এবং সাধনা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ষড়যন্ত্রকারীরা বসে ছিল না। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল। চক্রান্তকারীরা এটা ভালো করে বুঝেছিল বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন একত্রে থাকলে তাদের স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না। তাই তারা প্রথমে চেষ্টা করে বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝিয়ে তাজউদ্দীনকে দূরে সরিয়ে দিতে। ষড়যন্ত্রকারীদের এই চেষ্টা সফল হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাকশাল প্রশ্নে এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নিয়ে তাজউদ্দীনের দূরত্ব তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রদান করেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বুকভরা অভিমান নিয়ে তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা থেকে দূরে সরে আসেন। তাজউদ্দীন আহমদের এই দূরে সরে যাওয়া বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের জন্য ছিল এক বিরাট ক্ষতি। মুক্তিযুদ্ধকালীন চরমপত্রের রচয়িতা ও পাঠকারী এমআর আখতার মুকুলের ভাষায় ‘…বঙ্গবন্ধুর কোমর থেকে শানিত তরবারি অদৃশ্য হয়ে গেল।’

নির্মোহ, নির্লোভ এবং নিরহঙ্কার এক অনন্য রাজনৈতিক ছিলেন তাজউদ্দীন। তাজউদ্দীনের জীবদ্দশায় তার সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাসের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহ বঙ্গবন্ধুকে শোনাতে না পারা। আর বঙ্গবন্ধু নিজেও কোনোদিন কোনো কথা তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চাননি। তাজউদ্দীনের এই বলতে না পারা এবং বঙ্গবন্ধুর জানতে না চাওয়া ছিল যেন ঐতিহাসিক ভুল।

যে ভুলের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিল ষড়যন্ত্রকারীরা। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের কথা যদি বঙ্গবন্ধু নিজ কানে তাজউদ্দীনের মুখ থেকে শুনতেন, তাহলে হয়তো কোনোদিনই তাদের সম্পর্কে ষড়যন্ত্রকারীরা ফাটল ধরাতে পারত না। ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু হতেন সচেতন, হতো না ভুল বোঝাবুঝি, সৃষ্টি হতো না দূরত্ব, বন্ধন হতো তাদের আরও সুদৃঢ়। আর এর ফলে বাঙালি জীবনে হয়তো নেমে আসত না ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের মতো নির্মম করুণ কারবালার দিন।

আজকের এই বাংলাদেশ হতে পারত অন্য এক সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাজউদ্দীন আহমদ বড় আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, আজ আমি যদি মন্ত্রিসভায় থাকতাম তাহলে কেউ বঙ্গবন্ধুর গায়ের লোম পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারত না। তিনি আরও বলেছিলেন, মুজিব ভাই জেনে যেতে পারলেন না কারা তার বন্ধু ছিল আর কারা তার শত্রু ছিল। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই মাস ১৮ দিনের মাথায় সংঘটিত হয় বাঙালির ইতিহাসের আরেক নির্মমতার করুণ কাহিনী- ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ড। নির্মমভাবে শহীদ হন কীর্তিমান এই মহান পুরুষ বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ।

আমাদের জন্য পশ্চাতে রেখে যান তার সমগ্র জীবনের মহান সাধনা, আত্মত্যাগ ও শ্রেষ্ঠ অর্জন লাল-সবুজের এই বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাঙালি জাতির জন্য তিনি রেখে গেছেন অনন্য নজির, যা তাকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে। জন্মবার্ষিকীতে কীর্তিমান এই মহান নেতার প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।

সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা