আন্তর্জাতিকইতিহাসবাংলাদেশ

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অবদান || শাহরিয়ার কবির

(সূচনা পর্ব)

বাঙালি জাতির পাঁচ হাজার বছরের লিখিত ও অলিখিত ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অর্জন হচ্ছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় বিজয় এবং স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এই স্বাধীনতার জন্য বাঙালিকে যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া বিশ্বের অন্য কোনো জাতিকে তা দিতে হয়নি। বাংলাদেশের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগের মতো মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলগুলো ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’, ‘আলশামস’ প্রভৃতি ঘাতক বাহিনী গঠন করে তিরিশ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। সরকারি হিসেবে দুই লক্ষ, বেসরকারি হিসেবে পাঁচ লক্ষাধিক নারীকে তাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। এক কোটি মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।

৭২-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে যেভাবে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জনপদে ঘুমন্ত মানুষের উপর মেশিনগান, মর্টার, ট্যাঙ্ক ও কামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বিচারে গণহত্যা আরম্ভ করেছিল তা অব্যাহত ছিল ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। ইতিহাসের সেই দুঃসময়ে বাংলাদেশের অসহায় মানুষকে বাঁচাবার জন্য এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা বিশ্বে তুলে ধরার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের সরকার ও সর্বস্তরের মানুষ যেভাবে সহযোগিতা করেছে মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তা বিরল।

২৬ মার্চ ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা বেতার ও টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে এবং রাজধানী ঢাকায় কারফিউ জারি করে বাংলাদেশকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। আক্রান্ত সাধারণ মানুষ জানত যে, ভারত ছাড়া তাদের বাঁচবার আর কোনো পথ নেই। কিন্তু ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যে বৈরি সম্পর্ক তারা পূর্ব পাকিস্তানের বিপন্ন মানুষদের আশ্রয় দেবে কিনা এ নিয়ে অনেকের সন্দেহ ছিল। সেই সংকট মুহূর্তে ২৭ মার্চ আকাশবাণীতে অভয়দাত্রী দেবীর মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কণ্ঠ ভেসে এল- বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে তার সরকার সব রকম সহযোগিতা প্রদান করবে।

তার এই বক্তব্যের পরই লক্ষ লক্ষ মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নেয়ার আগে ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকরা মুসলিম লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তত্ত্ব অনুযায়ী ভারতকে তিন টুকরো পাকিস্তান নামক একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল। পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নাহ এর আগে বলেছিলেন, ভারতে মুসলমান ও হিন্দু দুটো স্বতন্ত্র জাতি, একদেশে যাদের পক্ষে একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির ছয় মাসের ভেতরই বাঙালি মুসলমানের মোহভঙ্গ হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের আইনসভায় বাংলা কংগ্রেসের ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যখন প্রস্তাব করলেন নতুন রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত, তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কঠোর ভাষায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এর ভেতর বিচ্ছিন্নতার গন্ধ আবিষ্কার করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মেয়াদ নয় মাসের হলেও বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের সূচনা ঘটেছে ’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন থেকে। ’৪৮-এ সূচিত ভাষা আন্দোলন এবং ’৫৪-র নির্বাচনে পাকিস্তান অর্জনকারী মুসলিম লীগের ভরাডুবির ভেতর ধ্বনিত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট এই কৃত্রিম রাষ্ট্রের মৃত্যুঘণ্টা। ’৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে পারে না। ষাটের দশকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগীকে নিয়ে গোপনে গঠন করেছিলেন ‘ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’ এবং প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্বাধীনতার। তার ছয় দফা এমনভাবে প্রণীত হয়েছিল যাতে বাঙালিত্বের চেতনা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের ভেতর জাগ্রত করা যায়।

বাংলাদেশকে যারা স্বাধীন করতে চেয়েছেন তারা জানতেন, ভারতের সহযোগিতা ছাড়া তা সম্ভব নয়। পাকিস্তানের শাসকরাও এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল। যে কারণে ’৪৮-’৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রাম ও জনগণের অভ্যুত্থানকে তারা পাকিস্তানকে দুর্বল করা অথবা ভাঙার ভারতীয় ষড়যন্ত্র এবং কমিউনিস্টদের চক্রান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে আরম্ভ করে ভাষা আন্দোলনের নায়করা এবং ’৭১-এর মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই ছিলেন তাদের কাছে ‘ভারতের চর।’
যে ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টারা এবং স্বাধীনতার প্রধান শত্রু পাকিস্তানী শাসকরা অভিন্ন দৃষ্টি পোষণ করেছে, যে ভারত ’৭১-এ বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে মুক্তিবাহিনীকে সব রকম সহযোগিতা প্রদান করেছে সেই ভারত সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণেতারা এবং গণমাধ্যমসমূহ দেশবাসীকে বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মকে এক রকম অন্ধকারেই রেখেছেন। এর কারণ হচ্ছে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও গত ৪৫ বছরে অধিকাংশ সময় এ দেশটি শাসন করেছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি।

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয়েছিল এ কথা যেমন সত্য, একইভাবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডের নিকট পাকিস্তান পরাজিত হলেও তাদের ভাবধারার অনুসারী ব্যক্তিরা এদেশে কম ছিল না- যারা এই পরাজয় মেনে নেয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী প্রভৃতি দলের প্রায় ৩৭ হাজার নেতা ও কর্মীকে দালালীর অভিযোগে গ্রেফতার করা হলেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সুযোগে এদের দুই তৃতীয়াংশেরও অধিক কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তখন থেকেই এরা পাকিস্তানের পক্ষে এবং ভারতের বিপক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণায় লিপ্ত হয়। উগ্র বামদেরও কারও কারও বক্তব্য ছিল এদের মতো।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্যের প্রধান বিবেচনা ছিল রাজনৈতিক। তবে এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকে বলে থাকেন ভারত তার জন্মশত্রু পাকিস্তানকে দুপাশে রেখে প্রথম থেকেই খুবই অস্বস্তিতে ছিল। কারণ দুই সীমান্তে প্রতিরক্ষার জন্য ভারতকে বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছিল। যখন পাকিস্তানকে ভাঙার সুযোগ পাওয়া গেছে ভারত সঙ্গে সঙ্গে তা লুফে নিয়েছে। পাকিস্তানী গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতো এ ধরনের মত বাংলাদেশের একাধিক লেখকও পোষণ করেন। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই পাকিস্তানকে অখণ্ড দেখতে চেয়েছেন। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী সরদার আবদুল কাইয়ুম খান ৭ জানুয়ারি ’৯৬ তারিখে ভারতের এক বেসরকারি টেলিভিশন নেটওয়ার্কে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে ভারতের সৃষ্টি।

ভারতে নকশালপন্থী কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ মনে করেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ক্রমবর্ধমান নকশাল আন্দোলনকে দমন করার জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এঁরা আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ইন্দিরার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের এই সব মতের লেখক গবেষকদের বক্তব্যে কিছুটা সত্যতা থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে সাংবিধানিকভাবে ভারত হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আর পাকিস্তান একটি ধর্মভিত্তিক দেশ যা অধিকাংশ সময় শাসিত হয়েছে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনের অধীনে। পাকিস্তান প্রথম থেকেই ভারতের প্রতি যেমন সামরিক হুমকি ছিল একই সঙ্গে ভারতের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাজনীতিরও বিরোধী ছিল। পাকিস্তানের বিবেচনায় ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র এবং হিন্দুরা হচ্ছে মুসলমানদের শত্রু। পাকিস্তানের এই বিবেচনা ভারতের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। ’৭০-এর নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিজয়ে ভারত আশাবাদী হয়েছিল এ কারণে যে, এর ফলে পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরে আসবে এবং সামরিক উন্মাদনা কমবে। যেহেতু বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক দর্শন, এর ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রও ভারতের জন্য ছিল স্বস্তিদায়ক। এ কারণে ভারত চেয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসুক।

জেনারেল ইয়াহিয়া খান যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করেন তখন স্বাভাবিক কারণেই ভারত উদ্বিগ্ন হয়েছিল। ২৫ মার্চে বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর পাকিস্তানের নজিরবিহীন আক্রমণ, ২৬ মার্চ বেতারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং জেনারেল ইয়াহিয়ার ভাষণে শেখ মুজিবকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা ভারতকে প্রচণ্ডভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে যে নৃশংস গণহত্যা, নির্যাতন ও লুণ্ঠন শুরু করেছিল, যেভাবে লক্ষ লক্ষ সহায় সম্বলহীন মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছিল, যেভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলের বাঙালি অধ্যুষিত রাজ্যগুলি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করার জন্য দিল্লীর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল- সে সব ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে এ কথাই বলতে হয় বাংলাদেশকে তখন সাহায্য করা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জন্য নৈতিক কর্তব্য শুধু নয় প্রধানতম রাজনৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভারতের তৎকালীন নীতি নির্ধারকরা এ কথাও দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন পূর্বাঞ্চলের বাংলাভাষী রাজ্যগুলোতে, বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষে যে প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল সেটা যদি দিল্লী উপেক্ষা করতো তাহলে পশ্চিমবঙ্গই ভারতের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারতো।

২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যেখানে তিনি ‘বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন’ জানিয়েছিলেন। ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার যে ঘোষণা পাঠ করেন সেখানেও প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দানের আবেদন ছিল। ভারতীয় বেতার আকাশবাণী থেকেও এই স্বীকৃতি প্রদানের আবেদন প্রচার করা হয়েছে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা ভারত চলে গিয়েছিলেন। তাজউদ্দিন আহমদ ৩ এপ্রিল দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যখন সাক্ষাৎ করেন তখনও বাংলাদেশের সরকার ঘোষিত হয়নি কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে কথা বলেছেন।

মার্চের ৩০ ও ৩১ তারিখে কলকাতার কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিএম, ফরোয়ার্ড ব্লক প্রভৃতি দলের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতি’, ‘বাংলাদেশ সংহতি ও সাহায্য কমিটি’, ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’ গঠন করা হয়। আনন্দবাজারের দুই এপ্রিল তারিখে প্রকাশিত ‘মুক্তি সংগ্রামীদের সাহায্য দানে সংস্থা গঠন’ শিরোনামের এক সংবাদে এ সব কমিটি গঠনের খবর ছাপা হয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির সভাপতি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়। কার্যকরী সভাপতি ছিলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী বিজয় সিং নাহার এবং সহ-সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক সমর গুহ এমপি। সিপিএম নেতৃত্বাধীন ‘বাংলাদেশ সংহতি ও সাহায্য কমিটি’র সভাপতি ছিলেন জ্যোতি বসু, সাধারণ সম্পাদক সুধীন কুমার এবং কোষাধ্যক্ষ ছিলেন কৃষ্ণপদ ঘোষ। ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’ গঠিত হয় সিপিআই-এর উদ্যোগে। এ সকল সংস্থা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকম সাহায্য প্রদানের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানায়। এছাড়া বিশিষ্ট শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরাও মার্চের ৩০ তারিখ থেকে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে অনুরূপ দাবি জানান।

কূটনৈতিক স্বীকৃতির বিষয়টি কৌশলগত কারণে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রথম দিকে এড়িয়ে গেছেন কিন্তু অন্যান্য সহযোগিতার বিষয়ে তিনি প্রথম থেকেই পরিষ্কার বক্তব্য রেখেছেন। ১ এপ্রিল ’৭১ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ‘‘ভারতের জনগণ পূর্ব বাংলার পাশে: সংসদে প্রস্তাব’ শিরোনামে এক সংবাদে বলা হয়: ভারতের জনগণ পূর্ব-বাংলার পাশে আছে। বুধবার সংসদে সর্বসম্মত এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ওদের সংগ্রাম, ওদের আত্মবিসর্জন ব্যর্থ হবে না, ভারতের সর্বান্তকরণ সহানুভূতি এবং সাহায্য ওরা পাবেন। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংসদের উভয় কক্ষে তুমুল হর্ষধ্বনি ওঠে উল্লাস বয়ে যায়।

দুই পৃষ্ঠাব্যাপী প্রস্তাব উত্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। তাতে পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানকে অভিনন্দিত করা তো হলই, উপরন্তু অভিব্যক্ত হল তারা যে জয়যুক্ত হবেন এই দৃঢ় বিশ্বাস ও আশা।

নয়াদিল্লীর বিশেষ সংবাদদাতার বরাত দিয়ে সেখানে আরো লেখা হয়: ‘শ্রীমতী গান্ধী যখন বাংলাদেশের মানুষের এই সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গে ভারতের জনগণের সর্বান্তকরণ সহানুভূতি ও সমর্থনের আশ্বাস দেন, উভয় সভাই তখন দীর্ঘস্থায়ী করতালিতে মুখর হয়ে উঠে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ব বাংলার জনগণের নির্বাচনে জয়ের পরেই আমাদের বীর প্রতিবেশীদের যে মর্মান্তিক দুঃসময় এসেছে, তা তাদের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে আমাদেরও একাত্ম করেছে। তাদের সুন্দর দেশের উপর যে ধ্বংসলীলা চলছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পূর্ববঙ্গের সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে দমনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানি করা সশস্ত্র বাহিনীকে সেখানে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে সেখানকার জনগণ নির্ভুলভাবে যে বাসনা ব্যক্ত করেছেন, পাকিস্তান সরকার তা মেনে না নিয়ে জনগণের সেই রায়কে অমান্য করার নীতি বেছে নিয়েছেন। পাকিস্তান সরকার আইনসম্মতভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে, ক্ষমতা হস্তান্তর করতে শুধু অস্বীকারই করেননি, উপরন্তু জাতীয় পরিষদকে তাদের ন্যায্য ও সার্বভৌম ভূমিকা নিতে একতরফা ভাবে বাধা দিয়েছেন। বন্দুক, কামান, ট্যাংক, বিমান ও গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে নগ্ন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের মানুষের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।

ভারত সরকার ও ভারতের জনগণ সব সময়েই পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করে এসেছে। একই উপমহাদেশের অধিবাসী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে তাদের বন্ধন যুগ যুগ পুরাতন। এই অবস্থায় আমাদের সীমান্তের এত নিকটে যে মর্মান্তিক হত্যালীলা চলছে তাতে সভা উদাসীন থাকতে পারে না। নির্দোষ নিরীহ মানুষের উপর এই যে অভূতপূর্ব ভয়াবহ অত্যাচার চলছে আমাদের দেশের সব অঞ্চলের মানুষ স্বার্থহীন ও দ্বিধাহীন ভাষায় তার নিন্দা করছেন।’’

৪ এপ্রিল নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার দেশের উদ্বেগের কথা আবারও উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারত নীরব দর্শক থাকতে পারে না: প্রধানমন্ত্রী শিরোনামের সংবাদে আনন্দবাজার পত্রিকা খবরটি ছিল: ‘প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আজ এখানে নিঃ ভাঃ কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে ঘোষণা করেনঃ ভারতের সীমান্তের ওপারে পূর্ব বাংলায় যা ঘটছে, তাতে ভারতের পক্ষে নীরব দর্শক থাকা সম্ভব নয়- বাঞ্ছনীয় নয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সমাপ্তি ভাষণে এই মন্তব্য করায় সদস্যরা বিপুল হর্ষধ্বনি করে ওঠেন।

শ্রীমতি গান্ধী বলেন, ভারত কোন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কখনও নাক গলায়নি। সেইসঙ্গে বিশ্বের কোন অংশে উৎপীড়ন বা অন্যায় ঘটলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানাতে ভারত কোন দিন কার্পণ্য করেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা মোটেই স্বাভাবিক নয়। সারা পৃথিবীতে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।

শ্রীমতি গান্ধী আরো বলেন, এই মুহূর্তে আমরা পূর্ব বাংলার জনগণকে কী ধরনের সাহায্য করতে পারি, তা মাথা ঠাণ্ডা করে আমাদের ভেবে দেখতে হবে।’ কিন্তু বাংলাদেশকে সাহায্য প্রদানে আগ্রহী জনমত ইন্দিরা গান্ধীর এই উদ্বেগ এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতিকে পর্যাপ্ত মনে করেনি। প্রায় প্রতিদিন পত্রিকায় কোনো না কোনো সংগঠন সংবাদ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিবৃতি কিংবা লেখা ছাপা হয়েছে যেখানে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের দাবি জোরালো হচ্ছিল।

১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে শতাধিক বিদেশী সাংবাদিকের উপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ তাদের ভাষণে বারংবার বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়েছেন- আপনারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন। আপনারা আমাদের সংগ্রামে সাহায্য করুন। আপনারা ইয়াহিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করুন, যাতে সে তার হানাদার বাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ এপ্রিল ’৭১)

প্রখ্যাত কথাশিল্পী এবং আনন্দবাজার পত্রিকার তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষ ৩০ এপ্রিল আনন্দবাজারের উপসম্পাদকীয় পাতায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে এক মর্মস্পর্শী চিঠি লেখেন। ‘প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী বরাবরেষু’ শিরোনামের খোলা চিঠিতে এই খ্যাতিমান কথাশিল্পী লিখেছেন: ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি বাংলাদেশকে এখনও স্বীকৃতি দেননি। জানি না, অন্য কোনো সাহায্য দিয়েছেন কি না। সীমান্তের কয়েকটি অঙ্গনে ঘুরে কোনো প্রকার সাহায্যের বিশেষ কিছু চিহ্ন চোখে পড়েনি। সম্ভবত কূটনৈতিক কাণ্ডজ্ঞান এখনও আপনার হাত বেঁধে রেখেছে। এই সঙ্কোচের মানে বুঝি। কিন্তু দুনিয়ার বাকী সকলে? তারাও বোঝে তো? যতদূর টের পাচ্ছি, সবাই ধরে নিয়েছে, আমরা এর মধ্যে আছি। সেটা যদি রটেই থাকে, তবে আর অহেতুক লজ্জায় কাজ কী? জানি না, আমরা কখনও কোনো ভরসা ও-পারের মুক্তিকামীদের দিয়েছিলাম কি না। হয়তো দিইনি। দিয়ে থাকলে কিন্তু আজ পশ্চাদপসারণের কোনো অর্থ নেই, কোনো ক্ষমা নেই। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলির একটি দুটির সক্রিয় হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করছেন? যথা, আমেরিকা? আজ স্বতঃই ধারণা হয়, আওয়ামী নেতাদের বুঝি-বা প্রতারিত করেছে আমেরিকাও। পিণ্ডির স্থায়িত্বেই সম্ভবত ভূমণ্ডলের এই ভাগে মারকিন মন আর স্বার্থ আবদ্ধ। অন্যান্যদের কথা না বলাই ভাল। আওয়ামী লীগ চরিত্রগতভাবে বস্তুত এদেশের প্রাক-স্বাধীনতা কালের কংগ্রেস। জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া দলের মাধ্যমে এত বড় গণজাগরণ ঘটেছে, এটা কোনো বামপন্থী দেশের বিশ্বাসই হয় না। এদেশেও এই সত্যটা মেনে নিতে প্রগতিবাদীদের খারাপ লাগে। নানা খুঁত তারা বের করেন আওয়ামী নেতৃত্বের। দলীয় অপ্রস্তুতির, শেখ সাহেবের অন্তর্ধানের। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ত্রুটি ছিল না, একথা বলছি না। দূরদৃষ্টির অবশ্যই অভাব দেখা গেছে। অভাব দেখা গেছে সংগঠনেরও। তবু সব সত্ত্বেও যা ঘটেছে, আজও ঘটছে, তা অবিশ্বাস্য অলৌকিক। ভাষাকে ‘মা’ বলা, সেই মায়ের ভিতর দিয়ে দেশকে মাতৃরূপে গ্রহণ করা এসব সহজ ধারণায় অতীত। পৃথিবীতে মানুষ এযাবৎ বহু যুদ্ধ করেছে। করেছে নিজের জিগীষা মেটাতে, করেছে নারীর জন্য। আর্থনীতিক শোষণের বিরুদ্ধেও করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংগ্রাম এ তো শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, এ যে সংস্কৃতির জন্য! সাহিত্য আর সংস্কৃতির কি এত শক্তি? আমরা যারা সাহিত্য-সংস্কৃতি ভাঙিয়ে খাই, তারাও এতটা জানিনি। না আমাদের মধ্যে, না অন্যত্র এর পরিচয় পাইনি।…’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ভারতের বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা তখন সামগ্রিক পরিস্থিতি কিভাবে মূল্যায়ন করেছেন এটি হচ্ছে তার সাধারণ চিত্র। এই লেখায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের চাপও স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের বিষয়টি সরকারীভাবে ভারতের বিবেচনায় ছিল না। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল এভাবে যে, ভারত বাংলাদেশের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চায়। ইয়াহিয়ার উচিৎ নির্বাচিত গণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ভারত গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছে কঠোর ভাষায়, বাংলাদেশের সহায় সম্বলহারা মানুষদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে, মুক্তি সংগ্রামীদের সাহায্য করছে কিন্তু স্বীকৃতিদানের বিষয়টি সেই মুহূর্তে ভারতের জন্য খুবই স্পর্শকাতর ছিল। কারণ ২৬ মার্চের পর থেকেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো এবং গণচীন বাংলাদেশের সমস্যাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মনে করেছে এবং ভারতের ‘উষ্কানিমূলক’ আচরণের সমালোচনা করেছে।

৪ এপ্রিল যুগোশ্লাভ সংবাদ সংস্থা তানযুগ-এর সংবাদদাতা পিকিং থেকে জানাচ্ছে, ‘চীনা পত্রিকাগুলি এই প্রথম বাংলাদেশ সম্পর্কে খবর দিয়েছে। তারা কোনো মন্তব্য করেনি, কিন্তু এমনভাবে তথ্য প্রকাশ করেছে, যা থেকে মনে হয় যে, সেখানকার (বাংলাদেশের) পরিস্থিতি গুরুতর ও জটিল। ভারত পাকিস্তানের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে- পাকিস্তানের এই অভিযোগ চীনা পত্রিকাগুলি ফলাও করে ছেপেছে।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা ৫ এপ্রিল ’৭১)

বৃটিশ পার্লামেন্টেও ৩১ মার্চ শ্রমিক দলের এমপি পিটার শোর যখন বাংলাদেশের মানুষের উপর ইয়াহিয়া খান সরকারের বর্বর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানান এবং এ ব্যাপারে অনেক ইংল্যান্ডবাসীর ক্ষোভের কথা পাকিস্তানকে জানাবার জন্য পররাষ্ট্র সচিব স্যার আলেক ডগলাস হিউমকে অনুরোধ করেন, তখন স্যার আলেক গণহত্যার ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ কললেও এ কথা তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘পাকিস্তান একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ এপ্রিল ’৭১)

একই ধরনের মত মার্কিন সরকারও তখন পোষণ করতো। ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শদাতারা জানিয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো ছাড়া যেহেতু বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র মার্কিন প্রচারণার প্রভাবে এটা বিশ্বাস করত যে, ভারত সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গোলযোগ সৃষ্টি করছে সেজন্য তাদের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানে বিলম্ব করেছে। ইন্দিরা গান্ধীর এই মনোভাবকে কোনো কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল কিংবা পত্রিকার কলাম লেখক সুনজরে দেখেননি, সন্তোষকুমার ঘোষের মতো কংগ্রেস সমর্থকও যেমন তীর্যক মন্তব্য করেছেন। ইন্দিরা গান্ধীর এ ক্ষেত্রে করার কিছু ছিল না। পরে প্রমাণিত হয়েছে তিনি তড়িঘড়ি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তানের অভিযোগ সত্য প্রমাণ হতো, পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হতে পারতো যা সামাল দেয়া ভারতের পক্ষে খুবই কঠিন হতো।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতিদানের জন্য প্রথম থেকেই ভারতের ওপর চাপ দিচ্ছিল। ৬ মে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচার করা হয়: ‘ভারত এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।’ এর আগে বাংলাদেশ সরকারের এক মুখপাত্র আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিনিধিকে জানিয়েছিলেন, ‘আগামী সাত দিনের মধ্যেই অন্তত চারটি দেশ নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। এই দেশগুলি হলো- এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও বার্মা এবং ইউরোপে ফ্রান্স ও যুগোশ্লাভিয়া। ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার স্বীকৃতিও মন্ত্রিসভা আশা করছেন।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ এপ্রিল ’৭১)

|| শেষ পর্ব ||

৭ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। একই দিন নয়াদিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য এক বৈঠকে বসেছিলেন। আনন্দবাজার পত্রিকার এতদসংক্রান্ত সংবাদের শিরোনাম ছিল: ‘এখনই ভারতের স্বীকৃতি বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল হবে না। তবে মুক্তি আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হবে- প্রধানমন্ত্রী’।

নয়াদিল্লী থেকে বিশেষ সংবাদদাতা প্রেরিত এই সংবাদে বলা হয়: ‘আজ সকালে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বৈঠকে বসেছিলেন। প্রায় সকলেই বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। (ব্যতিক্রম: বিকানীরের মহারাজা ড. করণি সিং এবং মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ইসমাইল। দুজনের বক্তব্যে অবশ্য কিছু পার্থক্য ছিল) সকলের কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী যা বলেন তার মর্ম এইরকম: বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি ভারত পূর্ণ সমর্থন জানাবে কিন্তু বাংলাদেশকে এখনই কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া ওই দেশেরই স্বার্থের পরিপন্থী হবে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি প্রচুর সহানুভূতি থাকলেও স্বীকৃতির ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা চলছে। তবে তাজউদ্দিন সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না এমন কথা তিনি বলেননি বা সরকার এ ব্যাপারে ঠিক কী করবেন তার কোন আভাষ দেননি। শুধু স্পষ্টভাবে তিনি বলেন যে, কোন অবস্থাতেই ভারত ভীত নয়।’

‘‘ড. করণ সিংয়ের বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন আসলে ‘বাঙালীদের বিদ্রোহ’। ভারতে এ ধরনের ব্যাপার ঘটলে সরকার কী করতেন? কাশ্মীরের কথাও ভাবা দরকার।

তখন ইন্দিরাজী তাঁকে বলেন, কাশ্মীরে যারা হাঙ্গামা বাধাতে চায় তারা জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের পিছনে বিপুল গরিষ্ঠ সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশে গরিষ্ঠ অভিমত পাকিস্তান দাবিয়ে রাখতে চাইছে।

মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ইসমাইল যা বলেন তার মর্ম: এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে বা কোন সঙ্কট সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে ওই ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। তবে সরকার এ ব্যাপারে যে-কোন ব্যবস্থাই নিন না কেন তার প্রতি তাঁদের দলের সমর্থন থাকবে।

ইন্দিরাজী বলেন যে, বাংলাদেশের ব্যাপারকে কেন্দ্র করে কিছু লোক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চাইছে। সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

অধিকাংশ বিরোধী নেতা বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য জোর দাবি জানান। পরিস্থিতি সম্পর্কে ইন্দিরাজীর বিশ্লেষণ তারা মেনে নেননি। তারা বলেন যে, বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব তথ্য। স্বীকৃতি দিয়ে সরকার শুধু সেই তথ্যটিকেই মেনে নেবেন আর তাতে সেখানকার আন্দোলন জোরদার হবে। ভারত এ বিষয়ে দেরি করলে ভারতেরই ক্ষতি হতে পারে। এই দাবি জানান- সি পি এম, সি পি আই, ডি এম কে, জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, পি এস পি, এস এস পি, ফঃ-বঃ, আর এস পি। শ্রীইন্দ্রজিৎ গুপ্ত (সি পি আই) তার দলের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দেন। শ্রী এ কে গোপালন (সি পি এম) বলেন যে, পাকিস্তানকে ভয় না করে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকমের সাহায্য দেওয়া হোক। শ্রী কে মনোহরণ (ডি এম কে) শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী (জঃ সঃ), শ্রীচিত্ত বসু (ফঃ বঃ), শ্রীত্রিদিব চৌধুরী (আর এস পি) শ্রী এন জি গোরে (পি এস পি) ও শ্রী এল এন মিশ্র (আদি কং) একই দাবি তোলেন।’’

বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাও ইন্দিরা গান্ধীর ওপর ক্রমশ চাপ বৃদ্ধি করছিলেন। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী আগমন। জুলাইয়ের শেষের দিকে শরণার্থীর সংখ্যা ষাট লক্ষ অতিক্রম করে, যার শতকরা সত্তর ভাগই ছিল পশ্চিমবঙ্গে। শরণার্থীদের প্রচণ্ড চাপে তীব্র আর্থিক সংকটের পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা ও যোগাযোগ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেন্দ্রের ওপর উপর্যুপরি চাপ দেয়া হচ্ছিল শরণার্থীদের বোঝা বিভিন্ন রাজ্যের ভেতর ভাগ করে দেয়ার জন্য। সমস্যা বাঁধাল শরণার্থীরা। তারা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইল না। পশ্চিমবঙ্গের অজয় মুখার্জীর মন্ত্রিসভাকে প্রধানত আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং শরণার্থীদের চাপে রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় পদত্যাগ করতে হয়। ২৫ জুন থেকে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়। কেন্দ্রের দফতরবিহীন মন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে পশ্চিম বঙ্গের গভর্ণরের উপদেষ্টা বানিয়ে পাঠানো হল মূলত বাংলাদেশের বিষয়ে তদারকির জন্য।

জুলাইয়ের শেষের দিকে বিশ্বের রাজনীতিতে এক নাটকীয় ঘটনা ঘটল যা ভারতের জন্য ছিল খুবই উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়, কিসিঞ্জারের দূতিয়ালিতে আমেরিকার সঙ্গে চীনের বরফ শীতল সম্পর্কের অবসান ঘটল। এই ঐতিহাসিক ঘটনায় মধ্যস্থতার সুযোগ পেয়ে পাকিস্তান দুই বৃহৎ শক্তির প্রিয়পাত্রে পরিণত হল। ভারতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির জন্য নতুন শক্তিতে বলীয়ান পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ২ আগস্ট ঘোষণা করল ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে’ কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার করবে তারা। ভারতের সর্বস্তরের জনসাধারণ ইয়াহিয়া সরকারের এই ন্যক্কারজনক ঘোষণার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দিল্লী, কলকাতা, বম্বে প্রভৃতি বড় বড় শহরে শেখ মুজিবের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিল। ইন্দিরা গান্ধী সুস্পষ্ট ভাষায় পাকিস্তানকে জানিয়ে দিলেন শেখ মুজিবের বিচারের আয়োজন করা হলে এর পরিণতি ভাল হবে না। তিনি এই বিচার প্রহসন বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি লিখলেন। ৪ আগস্ট সংসদের সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা শেখ মুজিবের জীবন রক্ষার জন্য যে কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। বিরোধী দলের সদস্যরা এ সুযোগে আবারও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের কথা বলেন।

ঠিক যে রকম নাটকীয়ভাবে চীন মার্কিন সম্পর্ক ঘটেছিল একইভাবে ৯ আগস্ট ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নয়াদিল্লীতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এবং সফররত সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকো বিশ বছর মেয়াদী এই মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল চুক্তিকারী দুটি দেশের কোনোটি যদি তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয় অপর দেশ তার মিত্রের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। ভারত আক্রান্ত হলে সোভিয়েত এবং সোভিয়েত আক্রান্ত হলে ভারত তাকে সবরকম সাহায্য করবে। বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ প্রবাহে, পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতের সমর্থন দানের পটভূমিতে এই চুক্তি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যা বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনসাধারণের মনোবল যেমন বাড়িয়েছে তেমনি ভারতের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকেও উৎসাহিত করেছে। চুক্তির পরই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সামরিক সাহায্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং ভারত আরও দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশকে সাহায্যের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

ভারতের উগ্র বাম কিংবা দক্ষিণপন্থী দলগুলো অবশ্য ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তিকে সুনজরে দেখেনি। অতি বামরা সমালোচনা করেছে এই বলে যে, এর দ্বারা ভারত ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ সোভিয়েত ইউনিয়নের উপনিবেশে পরিণত হবে। দক্ষিণপন্থীরা বলেছে, এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ভারত তার জোট নিরপেক্ষ চরিত্র জলাঞ্জলি দিয়েছে।

দেশের ভেতরে বিরোধী দলগুলোকে বুঝিয়ে স্বমতে এনে কিংবা অতিবিরোধীদের শক্ত হাতে দমন করে ইন্দিরা গান্ধী অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে নিরাপদ হলেও পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকারী আমেরিকা এবং পশ্চিমা শক্তিসমূহের চাপ তাঁর জন্য ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমা শক্তিবর্গকে পাকিস্তানের পর্যায়ক্রমিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধাচারণ করা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভারতের সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রথমে দিল্লীতে অবস্থানরত রাষ্ট্রদূতদের বোঝানো, তারপর বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানের কাছে মন্ত্রী পর্যায়ের দূত পাঠানো এবং পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সহ ৮টি দেশ সফর করার মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য দেশগুলোকে তাঁর অবস্থান আংশিকভাবে হলেও বোঝাতে পেরেছিলেন। তবে পশ্চিমের সরকারসমূহ বোধগম্য কারণে পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং তার প্রশাসনকে বোঝাবার জন্য- পাকিস্তান যা করছে তা ঠিক নয়। এই সময়ে তিনি আমেরিকাসহ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেছিলেন উপমহাদেশের পরিস্থিতি তাদের জানাবার জন্য এবং বিশেষভাবে পাকিস্তানের কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন বন্ধ করে তাঁকে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য।

৪ নভেম্বর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে আলোচনার সময় শ্রীমতি গান্ধী যখন বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছিলেন তখন নিক্সন তা উপেক্ষা করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী পররাষ্ট্র সচিব টি এন কল এ প্রসঙ্গে আমাকে বলেছেন, ‘মিসেস গান্ধীর কথা শুনে নিক্সন বললেন, শেখ মুজিব কোথায় আমি জানি না। তিনি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তাও জানি না। আপনি তাড়াহুড়ো করে কিছু করবেন না। দু এক বছর অপেক্ষা করুন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ভারতের কাঁধে তখন বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীর বিশাল ভার। যে কোনো সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেলেন, অপেক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত সময় তাদের হাতে নেই। নিক্সনের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং শীতল। রাতে নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তিনি ৩৬ হাজার মাইল ভ্রমণ করেছেন। ৩৭৫ টি মিটিং করেছেন এবং বিভিন্ন দেশে সাড়ে তিন লাখ সম্মানিত নাগরিকের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি এখানে এসেছেন শান্তির প্রত্যাশা নিয়ে।’ (অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, সমকাল, ৬ ডিসেম্বর ২০১৬)

বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের ক্ষেত্রে ভারতের সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যম যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, একইভাবে বিদেশী গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের শরণার্থীদের দুর্দশা, মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের নিদর্শনসমূহ দেখানোর ব্যবস্থাও ভারতকে করতে হয়েছিল। আমন্ত্রণ জানাতে হয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সদস্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের।

এই সব সফল এবং কূটনৈতিক তৎপরতা যে শুধু সরকারী পর্যায়ে হয়েছিল তা নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহের কাছে তুলে ধরার জন্য সিপিআই’র নেতৃবৃন্দকে সেসব দেশে যেতে হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে দিল্লীতে সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। প্রখ্যাত ফরাসী বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে মালরো, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, বলেছিলেন বাংলাদেশ যদি মুক্তিযুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সবার আগে তিনি ব্রিগেডে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবেন।

মকবুল ফিদা হোসেনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর ছবি এঁকে বোম্বের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন শরণার্থীদের সাহায্য করার জন্য। বিকাশ ভট্টাচার্য, প্রকাশ কর্মকার, শ্যামল দত্তরায় আর গণেশ পাইনের মতো খ্যাতমান শিল্পীরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে মাসের পর মাস বাংলাদেশের ওপর ছবি এঁকে বিক্রি করেছেন এবং ছবি বিক্রির টাকা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে দিয়েছেন। শিল্পী বাঁধন দাস ছবি আঁকা ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে গিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্র খুলেছিলেন তাঁর এক ডাক্তার বন্ধুকে নিয়ে। অন্নদাশঙ্কর রায়, মৈত্রেয়ী দেবী, দীপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, শান্তিময় রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, প্রণবরঞ্জন রায়, তরুণ সান্যাল, নিখিল চক্রবর্তী, রমেণ মিত্র, ইলা মিত্র, গীতা মুখার্জী, স্বাধীন গুহ, সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তী, দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়, প্রণবেশ সেন, সন্তোষ কুমার ঘোষ, গোবিন্দ হালদার, অংশুমান রায়, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, হিরন্ময় কার্লেকার, অমিতাভ চৌধুরী, সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত, মানস ঘোষ, বাসব সরকার, অধ্যাপক দিলীপ চক্রবর্তীর মতো খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেরাই রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধায়। দিল্লীর শিল্পী নীরেন সেনগুপ্ত, ধীরাজ চৌধুরী, জগদীশ দে আর বিমল দাসগুপ্তের মতো শিল্পীরা দিল্লী, বোম্বে আর কলকাতায় প্রদর্শনী করে ছবি বিক্রির টাকা তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ তহবিলে। বোম্বের চলচ্চিত্র জগতের সাড়া জাগানো তারকা সুনীল দত্ত, নার্গিস, ওয়াহিদা রেহমান, বিশ্বজিৎ, প্রাণ, শাম্মী, লতা মঙ্গেশকর, সলিল চৌধুরী, লক্ষীকান্ত-পেয়ারেলাল ও শচীন দেব বর্মন সহ এমন কেউ ছিলেন না যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেননি। শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন, গাইয়েরা বাংলাদেশের জন্য গান গেয়েছেন, নাটকর্মীরা নাটক করেছেন, ঋত্বিক ঘটক, হরিসাধন দাসগুপ্ত, শুকদেব আর গীতা মেহতারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের মতো লেখক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছেন। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের ভেতর এমন ব্যক্তি খুব কমই পাওয়া যাবে যারা কোনো না কোনোভাবে তখন বাংলাদেশকে সাহায্য করেননি।

সচেতন ও খ্যাতিমানদের পাশাপাশি ভারতের সাধারণ মানুষ যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং শরণার্থীদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছিল পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো দেশে এরকম নজির নেই। এই লেখকের নিজের চোখে দেখা হাজারও ঘটনার একটি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। বহরমপুর সীমান্তের কাছে বাংলাদেশ থেকে আসা একটি মুসলমান কৃষক পরিবার, স্বামী-স্ত্রী ও একটি শিশু আশ্রয় নিয়েছে গ্রামের এক হিন্দু কৃষক পরিবারের বাড়িতে। আশ্রয়দাতার বাড়িতে দুটি মাত্র ঘর, একটি রান্নার আর একটি শোয়ার। আশ্রয়দাতা শোয়ার ঘরটি ছেড়ে দিয়েছে আশ্রিতকে, নিজেরা থেকেছে রান্নাঘরে। দু মাস পর এই মুসলমান পরিবারটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় লাভ করে। দুই থেকে তিন লক্ষ শরণার্থী চেনা অচেনা সাধারণ মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল যাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও হৃদয়ের বিশালতা ছিল অন্তহীন।

সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির বিবরণ দিতে গিয়ে একটি মর্মস্পর্শী ঘটনার উল্লেখ করেছেন তাঁর এক লেখায়-

‘চার যুগ ধরে বসবাস করা সত্ত্বেও ‘উদ্বাস্তু’ তকমাটা দেওয়াই আছে। কলকাতার উপকণ্ঠে বেশ কিছু অঞ্চল এখনও ‘উদ্বাস্তু অঞ্চল’ বলেই পরিচিত। এখানকার অধিবাসীরা সেই কবে ১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব বাংলা থেকে এসে স্থায়ীভাবে ঘর বেঁধেছেন। ভারতের নাগরিকত্বও পেয়েছেন। তাঁদের পুত্র-কন্যা কলকাতার জলবায়ুতেই জন্মগ্রহণ করেছে বড় হয়েছে। তবুও ‘উদ্বাস্তু’ কথাটা অঞ্চলের সঙ্গে লেপটেই আছে। কলকাতার উপকণ্ঠে দমদমে এমনি এক উদ্বাস্তু অঞ্চলে আমাদের বাড়ি। আমাদের প্রতিবেশী গোঁড়া ধর্মপ্রাণ এক ব্রাহ্মণ পরিবার। এই পরিবারে ওদের জন্ম, ১৯৭১ সালে। ওরা যমজ ভাই-বোন, এদের আমি ভালো করেই জানি। জন্মের পর পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী ওদের আত্মীয়রা যমজ ভাই-বোনের নামকরণ করলো নারায়ণ আর লক্ষ্মী। কিন্তু কী আশ্চর্য! পরিবারের কর্তা, যাকে আমি রক্ষণশীল বলেই জানতাম, সে কিন্তু ওদের নাম রাখলো ‘মুজিব’ আর ‘মুক্তি’ । মুজিবুর থেকে সংক্ষেপে মুজিব। ওরা এখন বড় হয়েছে, এই যমজ ভাই-বোন, এখন পূর্ণ যৌবনে। ১৯৭১-এ জন্ম হলেও একাত্তরের দিনগুলি জানার কিংবা অভিজ্ঞতার কোনও সুযোগ এদের নেই। (একাত্তরের রাত-দিন, সপ্তাহ ১৮ আগস্ট ৯৫, কলকাতা)

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে অনেকে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করেন। ইতির পরিবর্তে নেতি অনুসন্ধানের চেষ্টাই আমাদের লেখক গবেষকদের একটি বড় অংশ সব সময় করেছেন। তারা ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না, বহরমপুরের দরিদ্র কৃষক, সাধারণ মধ্যবিত্ত, খ্যাত-অখ্যাত অগণিত মানুষ কেন ৭১-এ বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষদের সাহায্য করার জন্য এতটা ব্যাকুল হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এক কোটি মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। ২৬ মার্চ থেকে ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার ভীত সন্ত্রস্ত অসহায় বাঙালি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গিয়েছিল যাদের ভেতর হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ- সব ধর্মের অনুসারীই ছিল। ত্রিপুরা রাজ্যের মোট জনসংখ্য ৭১-এ ছিল ১৩ লক্ষের মতো। সেই ত্রিপুরা বাংলাদেশের ১৪ লক্ষের বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ত্রিপুরার মহারাণী বিভূকুমারী দেবী বলেছেন, তাদের গোটা রাজপ্রাসাদ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছিল। অথচ পাকিস্তান সব সময় বলেছে শরণার্থীর সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি হবে না। পাকিস্তান কী উদ্দেশ্যে প্রকৃত সত্য গোপন করেছিল সেটি জানা যাবে ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য থেকে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জার্মান সফরকালে ১১ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে ‘জার্মান সোসাইটি ফর ফরেন পলিসি’র দফতরের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে শরণার্থী সমস্যা সম্পর্কে বলেন, শরণার্থীদের সংখ্যা সম্পর্কে আমাদের সরকারী কর্মকর্তারা বলেন ৯৭ লাখ। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে দুই তিন লাখ বেশি হবে। শরণার্থীদের অনেকে ক্যাম্পে থাকার পরিবর্তে তাদের পরিচিত জনদের সঙ্গে রয়েছে। ক্যাম্পে যারা থাকে তাদের প্রত্যেকের রেশন কার্ড আছে। রেশন কার্ড ছাড়া কাউকে খাবার দেয়া হয় না। ফলে আমাদের বিলক্ষণ জানা আছে শরণার্থীর সংখ্যা কত। আমাদের হিসেবে তিরিশ লাখ মুসলমান শরণার্থী আছে। পাকিস্তানীরা যে হিসেব দিচ্ছে সেখানে তারা হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধদের বাদ দিয়ে গুণছে। আমরা তা করতে পারি না। আন্তর্জাতিক মহলের অভিমত যা-ই হোক আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, আমরা এই শরণার্থীদের ভারতে থাকতে দেবো না। এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত এবং আমার দেশও তাই। আমরা এক বিশাল বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি অথচ বাইরে থেকে কোনো রকম সাহায্য পাচ্ছি না বললেই চলে। যখন আমরা জাতিসংঘকে এ বিষয়ে জানিয়েছি তারা বলেছে এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আমরা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। ওদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি অথচ জাতিসংঘ বলছে, আমরা খুবই দুঃখিত। পাকিস্তানে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয় আমাদের কিছু করার নেই। এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। (বাংলাদেশ ডক্যুমেন্টস দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯১, প্রাগুক্ত)

এক কোটি শরণার্থীর ভার বহনের জন্য ভারতকে এক বিশাল অঙ্কের অর্থ বহন করতে হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ শরণার্থীদের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে যে অর্থ সাহায্য করেছে তার পরিমাণ ভারতীয় টাকায় মাত্র ৫০ কোটি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতকে ব্যয় করতে হয়েছে ২৬০ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের হিসেব ধরা হয়েছিল ৫৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। (জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে দেয়া ভারতের পুনর্বাসন সচিব জি এস কাহ্লন-এর বিবৃতি, বাংলাদেশ ডক্যুমেন্টস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৩, প্রাগুক্ত)

শরণার্থীদের জন্য ব্যয়ের হিসেব বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক সাহায্যের পরিমাণ টাকার অঙ্কে কত ছিল এ তথ্য কেউ দিতে পারেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা বলেছেন আমরা যদি টাকা ফেরত চাইতাম তাহলে সাহায্যের টাকার অঙ্ক লিখে রাখতাম। ভারতীয়রা লিখে না রাখলেও বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের নাগরিকদের জানা দরকার শুধু শরণার্থীদের জন্য ভারত ৭১ সালে ব্যয় করেছিল টাকার বর্তমান মানে ২,৩১০ কোটি টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অন্যান্য রসদ সরবরাহসহ সামরিক খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে যা হিসেব করা যাবে না তা হচ্ছে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য ভারতের প্রায় সতের হাজার অফিসার ও জওয়ান শহীদ হয়েছেন। টাকার অঙ্কে হিসেব করা যাবে না সাধারণ মানুষের ভালবাসা ও সহমর্মিতা।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে নিয়োজিত সাত কোটি বাঙালির জন্য একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর ছিল এক অসামান্য আনন্দের দিন, যেদিন ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে। মুজিবনগর সরকারের উপর্যুপরি অনুরোধ এবং যুদ্ধরত বাঙালির তীব্র প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টের অধিবেশনে যখন ঘোষণা দিলেন তাঁর সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন সরকারী ও বিরোধী দলের সদস্যরা ‘জয় বালাদেশ’ বলে বিপুল হর্ষধ্বনি করে ওঠেন। আনন্দ প্রকাশের জন্য এই দিনের অধিবেশন শ্রীমতি গান্ধীর ভাষণের পর পরই মুলতবি ঘোষণা করা হয়। এর আগে ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ভারতের উপর পাকিস্তানের আগ্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে শেষবারের মতো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ জানান।

৬ ডিসেম্বর সকালে ভারতের লোকসভার অধিবেশন শুরু হওয়ার অল্পক্ষণ পরই শ্রীমতি গান্ধী বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, আমার সঙ্গে এই সভা বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁদের সহকর্মীদের অভিনন্দন জানাবেন। জনগণের সংগ্রাম, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সংযোজন করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি, বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে, বাংলাদেশ সরকারের উপর্যুপরি অনুরোধের প্রেক্ষিতে, সব দিক সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে ভারত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে। এই মুহূর্তে আমাদের মন পড়ে রয়েছে এই নতুন রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে।’

শ্রীমতি গান্ধী তাঁর ভাষণে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেছে তাদের রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এমন এক সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা যেখানে ধর্মে, বর্ণে বা নারীপুরুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকবে এবং যে কোনো ধরনের উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করবে। ভারতও এই সব আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।’

৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ৪ ডিসেম্বরের চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে লিখেছিলেন: ‘আমার ভারত সরকারের সহকর্মীবৃন্দ এবং আমি ৪ ডিসেম্বর প্রেরিত মহামান্য রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আপনার বার্তা পেয়ে গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছি। …বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত দুঃখ দুর্দশার ভেতর কালযাপন করছেন। আপনাদের তরুণরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য এক আত্মোৎসর্গী যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। ভারতের জনগণও এই সব মূল্যবোধ রক্ষার জন্য লড়াই করছে। আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমাদের এই অনুপূরক প্রচেষ্টা এবং আত্মত্যাগ দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব এবং মহৎ আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করবে।’

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণার আগে শ্রীমতি গান্ধী আমেরিকা এবং ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্র সফর করে তাদের মনোভাব জেনে এসেছেন। যারা বিরুদ্ধে ছিল তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কাউকে পক্ষে এনেছেন, কিংবা পাকিস্তানকে ঢালাও সমর্থন থেকে বিরত রেখে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়কে অনিবার্য করে তুলেছেন। বৃটিশ পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি ৭১-এর ৬ ডিসেম্বর তাদের পর্যালোচনায় শ্রীমতি গান্ধীকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মহিলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। ৭ ডিসেম্বর আনন্দবাজারে ইউ এন আই পরিবেশিত এক সংবাদে বলা হয়: ‘৬ ডিসেম্বর লন্ডনের মিরর-এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, পূর্ব বাংলায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এখনও যে ৭০ হাজার সৈন্য রয়েছে, তাদের খতম করাই শ্রীমতি গান্ধীর ন্যূনতম সামরিক লক্ষ্য। রাষ্ট্রপতি দেরিতে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে এই সুন্দরী অসমসাহসী রমণী ও আজকের বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী মহিলাকে নিরস্ত করার সম্ভাবনা নেই।’

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য ছিল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের স্বীকৃতি আদায় করা। দিল্লীতে তখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রধান ছিলেন এক সময়ের জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। তার কাছে সেদিনের অনুভূতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, আমার স্পষ্ট মনে আছে ১৯৭১-এর ৬ ডিসেম্বর আমি কলকাতা থেকে দিল্লী আসছিলাম। কলকাতা গিয়েছিলাম বিশেষ কারণে। দিল্লী আসার সাথে সাথে আমাকে জানানো হলো ভারত আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা তখন খুবই উল্লসিত হলাম- প্রথম দেশ আমাদের স্বীকৃতি দিল স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে। আমি বাসায় গিয়েই টেলিফোন করে মিসেস গান্ধীকে ধন্যবাদ জানালাম। তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় আমাকে অভিনন্দন জানালেন। এর কিছুক্ষণ পরই আমাকে ভুটানের রাষ্ট্রদূত টেলিফোন করলেন- উনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। ওনাকে বললাম, আসেন। এসে উনিও বললেন- উনি একটা চিঠি দিলেন। সেই চিঠি মারফত জানতে পারলাম ভুটানও আমাদের সেই দিনই স্বীকৃতি দিয়েছে।’

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রতিবাদে পাকিস্তান ৬ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সেদিন ভারতের এই স্বীকৃতি ছাড়া, ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এবং জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে প্রবল প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন ছিল সুদূর পরাহত। ৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে দিল্লীতে কয়েক ঘণ্টার জন্য যাত্রাবিরতি করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য এবং তাঁর মুক্তির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও জনমত গঠনের তিনি শ্রীমতি গান্ধীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে ভারতের জনগণের উদ্দেশ্যে শ্রীমতি গান্ধী বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বাধীনতার এবং তিনি তা দিয়েছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম বাংলাদেশের শরণার্থীদের সসম্মানে দেশে ফেরত পাঠাবো, মুক্তিযোদ্ধাদের সবরকম সাহায্য করব এবং বাংলাদেশের অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনব। আমিও আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের সময় বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায় অনুযায়ী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ৭২-এর ১৯ মার্চে। বঙ্গবন্ধু ভারতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বন্ধুত্বের। সেই প্রতিশ্রুতি দীর্ঘকাল বাংলাদেশ পালন করেনি। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত ও অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, সমরনায়ক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বুদ্ধিজীবীদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যার সূচনা হয়েছে ২০১১-এর জুলাই-এ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ইন্দিরা গান্ধী শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, লণ্ডনের ডেইলি মিররের ভাষায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতায় পরিণত হয়েছিলেন, যাকে নিরস্ত করার ক্ষমতা আমেরিকারও ছিল না। ৭১-এ ইন্দিরা গান্ধীও ভারত সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর ভারতে যারা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে ছিলেন, তাদের ভেতর যারা এখনও বেঁচে আছেন, তারা সকলেই চান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি ৭১-এর মতো বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। রক্তের অক্ষরে রচিত দুই দেশের বন্ধুত্বের বন্ধন অনন্তকাল অটুট থাকুক।
(শেষ)

Facebook Comments
Tags

Related Articles

Back to top button
Close
Close