যোগফল কেন?- আসাদুল্লাহ বাদল

0
196

যোগফল আবির্ভাব সংখ্যায় বিশেষ সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে। পাঠককে আলাদাভাবে শুভেচ্ছা জানানো হয়নি। চতুর্থ সংখ্যার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলাম।

পৃথিবী বদলে যায় বলা হয়। বদলে না এটি বলা যায় না। কিন্তু মানুষও পৃথিবীর চেহারা বদলে ফেলার জন্য যুক্ত ও জড়িত। আমরা যেনতেনভাবে যুক্ত থাকাকে, জড়িত থাকা বলি। আবার জড়িত থাকাকে যুক্ত থাকা বলি। আসলে যুক্ত ও জড়িত থাকার মধ্যে ফারাক কি?

আমি খুনের সাথে জড়িত আর আমি রাজনীতির সাথে জড়িত মোটেও এক কথা নয়। অপরাধে যুক্ত থাকা হচ্ছে জড়িত থাকা। আর সাধারণ কাজে যুক্ত থাকা তো যুক্ত থাকা। আমি সংস্কৃতির সাথে যুক্ত, জড়িত থাকা বলে কি সংস্কৃতিকে অপরাধের জায়গায় জায়গা করে দেই? ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকা জড়িত থাকা। কিন্তু অমুক সংগঠনের সাথে জড়িত আছি। এই জড়িত থাকা কি অপরাধ? যদি অপরাধ না হয় তাহলে অপরাধ অর্থে ব্যবহৃত শব্দ কেন বলি? যুক্ত থাকাকে জড়িত না বলে যুক্ত থাকা বলি। পজিটিভ চিন্তা করে মগজ বদলে ফেলি। পরে পৃথিবী বদলাই। সম্ভবত আমরা ঠিক সমাধান করতে পারবো না। তবে চেষ্টা চালাতে পারি। ঠিক আসলেই ঠিক। ঠিককে অধিকতর সবল করার জন্য সঠিক বলার দরকার নাই বলে আমরা ঠিক শব্দ ব্যবহার করি।

নানাবিধ স্কুলিং রক্ষার কারণে যোগফল চেষ্টা চালাবে। সংবাদপত্র যে কারণে টিকে থাকে, যে কারণে পাঠক সংবাদপত্র পাঠ করে, যে কারণে সংবাদপত্র ছাপা হয়; একই রকম কারণে লিফলেট পোস্টারও ছাপা হয়। কিন্তু ওইরকম সব কারণে আমরা যোগফল প্রকাশ করি না। যোগফল প্রকাশের আসল কারণ ক্রমেই জানা যাবে।

বর্তমানে জীবিত লেখকদের মধ্যে একজন প্রগতিশীল মানুষ হাসান আজিজুল হক। তিনি ১৯৯৩ সালে সংবাদপত্র সম্পর্কে একটি মত প্রকাশ করেন। আমাদের দেশে সংবাদপত্র বিতর্ক জিইয়ে রাখার প্রবণতা ধারণ করে বলে মনে করেন তিনি।

”একমাত্র খবরের কাগজই পারে মানুষের ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ হাজির করতে। পারে মানুষের পৃথিবীটাকে এক তিলিক নিরক্ত নিরস বিজবিজে অক্ষরের জগতে রূপান্তরিত করতে। আমরা কাগজের চেয়ে শুকনো কোন জিনিস দেখি না, কল্পনাও করতে পারি না। পাথরের দিকে চেয়ে মনে হতেও পারে ভিতরে কোথাও রস আছে; কিন্তু কাগজ তৈরি হয় চূড়ান্তভাবে পেশা হওয়ার পরেই, তার আগে নয়। যতক্ষণ রস আছে, ততক্ষণ তা কাগজ নয়। সমকালের পৃথিবী তার উপর চড়ানো যেন বইয়ের পাতার ভেতর প্রজাপতির কঙ্কাল। একেবারে পক্ষপাতহীন। বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন। আজকের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে মনে হতে পারে সংবাদপত্র বুঝি এইখানেই পৌঁছতে চায়। একটা পক্ষপাতহীন নিরপেক্ষ জগতের বর্ণনাই তার শেষ লক্ষ্য। বাসি খবরের কাগজ থেকে সমস্ত কালি মোচন করে আবার তাকে নিরপেক্ষ সাদা কাগজে নিয়ে আসা যেন মানব অনুভূতিশূণ্য নিরপেক্ষতা পাবারই একটি প্রক্রিয়া।” (এই অংশটুকু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ডক্টর প্রদীপ কুমার পা-ে ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আরেক শিক্ষক ডক্টর আমিনুল ইসলামের সহায়তায় প্রাপ্ত )।

এহেন মানব অনুভূতিশূণ্য নিরপেক্ষতার দায় থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সংবাদপত্রগুলোকে অবশ্যই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে জনগণের কল্যাণের পক্ষেই দাঁড়ানো প্রয়োজন। আমরা যোগফল দাঁড়াতে চাই জনগণের কল্যাণে। গ-ী যত ছোটই হোক আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে অধিকাংশ মানুষের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে দেখার।

সত্য গল্প বর্ণনার প্রশ্নে একাধিক সাংবাদিকতার ধরণ থাকতে পারে। বর্ণনামূলক সাংবাদিকতা, নয়া সাংবাদিকতা, সাক্ষরতা সাংবাদিকতা, সৃজনশীল সাংবাদিকতা, নন ফিকশন সাংবাদিকতা, ডকুমেন্টারি সাংবাদিকতা এখন নতুন ধরণের সাংবাদিকতার গতিতে যুক্ত। ফেসবুক বর্তমানে সাংবাদিকতার চেহারা পাল্টে দিয়েছে।

কর্মক্ষেত্র বিবেচনা করে ব্যবসায় সাংবাদিকতা, বিনোদন সাংবাদিকতা, ফার্ম সাংবাদিকতা, ফ্যাশন সাংবাদিকতা, স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান সাংবাদিকতা, খেলাধুলাবিষয়ক সাংবাদিকতা, পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিকতা, শিল্পবিষয়ক সাংবাদিকতা, শিল্পকলা বিষয়ক সাংবাদিকতা, রাজনীতিবিষয়ক সাংবাদিকতা, প্রযুক্তিবিষয়ক সাংবাদিকতা, অ্যাডভোকেসি সাংবাদিকতা, বিকল্প সাংবাদিকতা, বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতা, ডিজিটাল সাংবাদিকতা, চুরনালিজম বা প্রেসরিলিজ বিষয়ক সাংবাদিকতা, জন সাংবাদিকতা, কম্পিউটার সহায়ক সাংবাদিকতা, উপাত্তভিত্তিক সাংবাদিকতা, ডাটা সাংবাদিকতা, গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতা, ইলেকট্রনিক সাংবাদিকতা, গনজো সাংবাদিকতা বর্তমান বিশ্বে সাংবাদিকতার ভিত্তিমূলে ঠাঁই করে নিয়েছে।

এমবেডেড জার্নালিজম বা প্রথিত সাংবাদিকতা ও শকুন সাংবাদিকতা আমরা পরিহার করবো বলে সাংবাদিকতার মূল শ্রেণিতে এই দুই ধরণের সাংবাদিকতাকে স্থান দেই না। সংক্ষেপে বলে রাখি এমবেডেড জার্নালিজম হচ্ছে যুদ্ধের মাঠের সংবাদ যুদ্ধ শিবির দ্বারা সেন্সর করা সংবাদ। অন্যদিকে, শকুন সাংবাদিকতা হচ্ছে কোন অসুস্থ্য রোগী কবে কখন মারা যাবে আর তাৎক্ষণিক ওই মৃতের হালচাল পাঠককে জানোনোর লক্ষে তৈরি করে রাখা সংবাদ। এহেন প্রক্রিয়াকে মানব কল্যাণের বিপরীতে মনে হয়। আমরা যোগফল এ ধরণের সাংবাদিকতা পরিহার করে ভবিষ্যতে মানব কল্যাণমুখি বক্তব্য হাজির রাখবো। যোগফল কেন এই প্রশ্নের উত্তর একবাক্যে দিতে চাই না বলে অমীমামাংশিত রেখে যোগফল জারি রাখলাম।

রচনা : ২০ এপ্রিল ২০১৮। মোট শব্দ ৬৪৯।
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক যোগফল।