উপমহাদেশের বিখ্যাত শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান – কিশোরগঞ্জ

0
70

উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। ১৭৫০ সাল থেকে শোলাকিয়া মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে। সে হিসাব অনুসারে, শোলাকিয়া ঈদগাহের বয়স ২শ’ ৬৬ বছর। প্রতিষ্ঠার ৭৮ বছর পর ১৮২৮ সালে প্রথম বড় জামাতে এই মাঠে একসঙ্গে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়ালাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন। এই সোয়ালাখ থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’, যা উচ্চারণ বিবর্তনে হয়েছে শোলাকিয়া।

শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান
শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান -কিশোরগঞ্জ

বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশাখাঁ’র ষোড়শ বংশধর হয়বতনগরের জমিদার দেওয়ান মান্নান দাঁদ খান তার মায়ের অসিয়াত মোতাবেক ১৯৫০ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহের জন্য ৪.৩৫ একর জমি ওয়াক্‌ফ করেন। সেই ওয়াক্‌ফ দলিলে উল্লেখ রয়েছে, ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে। কিশোরগঞ্জ মৌজার এ মাঠের মূল আয়তন বর্তমানে ৬.৬১ একর। প্রাচীর ঘেরা শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে মোট ২৬৫টি কাতার রয়েছে যেখানে একসঙ্গে দেড় লক্ষাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। এছাড়া মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঈদগাহ সংলগ্ন খালি জায়গা, রাস্তা এবং নিকটবর্তী এলাকায় দাঁড়িয়ে সমসংখ্যক মুসল্লি এ বৃহত্তম ঈদজামাতে শরিক হন।

জনসমুদ্রে পরিণত হওয়া ঈদগাহ ময়দানে আগত মুসল্লিদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জামাত শুরুর সংকেত হিসেবে এ মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে ৩টি, ৩ মিনিট আগে ২টি এবং ১ মিনিট আগে ১টি শটগানের গুলি ছোড়া হয়। নামাজ শেষে দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহ্‌র জন্য মঙ্গল কামনা করে মুনাজাত পরিচালনা করা হয়। এ সময় লাখ লাখ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন রবে মুখরিত হয় চারদিক। ১৮২৮ সালের প্রথম বড় জামাতে হয়বতনগর সাহেব বাড়ির ঊর্ধ্বতন পুরুষ শাহ্‌ সূফী সৈয়দ আহমদ (রঃ) ইমামতি করেন। এ সম্পর্কে নানা তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, শাহ্‌ সূফী সৈয়দ আহমদ (রঃ) এর পূর্ব-পূরুষগণ সুদূর মক্কা শরীফ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে বর্তমান ভারতের বর্ধমান জেলার টেঙ্গাপাড়ায় বসবাস শুরু করেন।
সৈয়দ আহমদ (রঃ) এর পিতা সৈয়দ ইবরাহীম (রঃ) উত্তর কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা প্রচার-প্রসার ও দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জ শহর থেকে সাত মাইল দূরবর্তী কান্দাইল গ্রামে পদার্পণ করেন। পরবর্তীতে সেখানে স্থানীয় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বিবাহ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু সাংসারিক জীবনকে তিনি আবদ্ধজীবন মনে করে আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারের তাগিদে বেরিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশে তাবলীগ জামাতসহ মক্কা শরীফে চলে যান এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। এদিকে মরহুম সৈয়দ ইবরাহীম (রঃ) এর বাড়িতে রেখে যাওয়া গর্ভবতী স্ত্রীর এক পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। স্বামীর পূর্ব-নির্দেশ মোতাবেক পুত্রের নামকরণ ও পরবর্তী সময়ে বয়ঃপ্রাপ্ত হলে ১২ বছর বয়সে শিক্ষা-দীক্ষা লাভের উদ্দেশে ঢাকার আজিমপুর দায়রা শরীফে প্রেরণ করা হয়।

বালকপুত্র সৈয়দ আহমদ সেখানে ২৪ বছর অবস্থান করে শিক্ষা-দীক্ষায় পরিপক্ক জ্ঞান লাভের পর পীরের নির্দেশে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় চলে আসেন। সেখানে শহীদ ময়েজ উদ্দিন মজনু (রঃ) এর মাজারের পাশে একটি ঘর তৈরি করে ইবাদত-বন্দেগীসহ ইসলামের বাণী প্রচারে মনোনিবেশ করেন। ক্রমে সৈয়দ আহমদ (রঃ)-এর সুনাম ও সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে লোকজন তার কাছে এসে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন। এ সময় ঈশা খাঁ’র বংশধরগণ জঙ্গলবাড়ী ও হয়বতনগর এলাকার জমিদারদ্বয় সৈয়দ আহমদ (রঃ)কে শ্রদ্ধার আসনে স্থান দেন এবং তার সামগ্রিক দ্বীনি দাওয়াতী কাজের সহযোগিতা করেন। এ সময় সে এলাকায় কোনো মসজিদ না থাকায় ১৮২৭ সালে সৈয়দ আহমদ (রঃ) বাড়ি সংলগ্ন জায়গায় একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদ প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহ্‌ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি তার ক্রয়কৃত তালুক সম্পত্তিতে ঈদগাহ্‌ মাঠ প্রতিষ্ঠা করার মনস্থির করেন এবং এ ব্যাপারে জঙ্গলবাঈ ও হয়বতনগরের জমিদারদ্বয়কে সহায়তা করার অনুরোধ জানিয়ে আসন্ন ঈদুল ফিতরের প্রথম জামাতে শরিক হওয়ার দাওয়াত করেন।
জমিদারদ্বয় দাওয়াত কবুল করেন এবং এই অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোলাকিয়া ঈদগাহ্‌ ময়দানে ১৮২৮ সালের ঈদুল ফিতরের ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

শাহ্‌ সূফী সৈয়দ আহমদ (রঃ) এর ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের প্রথম জামাত। বৃহত্তম জামাতের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর এ ঈদগাহ্‌ মাঠে ১৮৯তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় শুরু হবে জামাত। এতে ইমামতি করবেন ইসলাহুল মুসলিহীন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ। এবারের ১৮৯তম ঈদ জামাতকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন ঈদগাহ্‌ মাঠ পরিচালনা কমিটি। শহরের মোড়ে মোড়ে নির্মাণ করা হচ্ছে শুভেচ্ছা তোরণ। রাস্তার দু’পাশে টাঙানো হচ্ছে রঙ-বেরঙের পতাকা ও ব্যানার। সংস্কার করা হয়েছে মিনার, অজুখানা। মুসল্লিদের প্রাকৃতিক কাজ-কর্ম সারার জন্য তৈরি করা হয়েছে বেশকিছু অস্থায়ী টয়লেট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ ঈদগাহে আসা মুসল্লিদের আপ্যায়ন ও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থাপন করা হচ্ছে অস্থায়ী স্বেচ্ছাসেবী ক্যাম্প। নামাজ চলাকালে মেডিকেল টিম ও অগ্নিনির্বাপক দলকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়। এছাড়া ঈদ জামাতকে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ করতে চার স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করে সে অনুযায়ী কাজ করছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ, র‌্যাব ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য ঈদগাহ মাঠকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে। পুরো এলাকায় বসানো হচ্ছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা।

পুরো মাঠ একাধিকবার সুইপিং করা ছাড়াও মাঠে ঢোকার ২২টি গেটে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করে মাঠের ভেতর প্রবেশ করতে দেয়া হবে। নিশ্ছিন্দ্র নিরাপত্তায় এখানে অনুষ্ঠিত হবে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত। নামাজ চলাকালে মেডিকেল টিম ও অগ্নিনির্বাপক দলকে সতর্কাবস্থায় রাখা হবে। এছাড়া স্কাউটদের একটি দল মুসল্লিদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত থাকবে। গৃহীত প্রস্তুতির বিবেচনায় লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে এবারো উৎসবমুখর পরিবেশে সুন্দর ও সুচারুভাবে ঈদ জামাত অনুষ্ঠানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ঈদগাহ কমিটি। শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের আকর্ষণীয় ও বিশাল জামাত একই সাথে গৌরবান্বিত ও ঐতিহ্যশালী করেছে কিশোরগঞ্জকে। এরপরও মুসল্লিদের স্থান সংকুলান, অবকাঠামো উন্নয়নসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার উন্নত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ঈদগাহ্‌ মাঠের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য মহাপরিকল্পনার কথা প্রায়শই শোনা গেলেও এটি কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মাঠের মাইকিং সিস্টেমের উন্নয়ন, মিনার সংস্কার, মাঠে প্রবেশের প্রধান তোরণ নির্মাণ, ৪৫টি ওজুখানা, ১৫টি প্রস্রাবখানা ও পাঁচটি টয়লেট নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। সামপ্রতিক সময়ে মাঠের মিম্বরটির কিছুটা সংস্কার ছাড়া মাঠের স্থায়ী উন্নয়নে তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের মাটিতেই জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে হয়।
বৃষ্টি হলে কর্দমাক্ত মাঠে নামাজ আদায়ে মুসল্লিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া প্রতি জামাতেই মুসল্লির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ফলে মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিপুল সংখ্যক মুসল্লি নামাজ না পড়েই বাধ্য হয়ে ফেরত যান। কিশোরগঞ্জকে দেশে-বিদেশে পরিচিত করেছে শোলাকিয়া ঈদগাহ। কিন্তু ২শ’ ৬৬ বছরের পুরাতন শোলাকিয়া ঈদগাহটি ঐতিহ্যের তুলনায় উন্নয়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

কিভাবে যাবেন?
গুলিস্তান থেকে প্রতি ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের বাস ছাড়ে ঈঁশাখা সার্ভিস, মহাখালী থেকে কিশোরগঞ্জ ট্রভেলস, অনন্যা, ডিজিটাল অনন্যা, এগারসিন্দুর, হাওড় বিলাস।
এছাড়া সায়েদাবাদ থেকে গেইটলক ঈশা খাঁ বাস সার্ভিস ভাড়া ১৫০ টাকা। যাতায়াত পরিবহনের বিআরটিসি’র বাস ছাড়ে কমলাপুর গোলাপবাগ থেকে ২০০ টাকা ভাড়ায় আড়াই ঘন্টায় কিশোরগঞ্জ যাওয়া যায়।
তাছাড়া সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ঢাকা কমলাপুর রেলষ্টশন থেকে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসে কিশোরগঞ্জ যাওয়া যায় ছুটির দিনে তিন ঘণ্টায় পেঁছোনো যায় কিশোরগঞ্জ। ট্রেনে সুভন চেয়ার ভাড়া ১৪০ টাকা, সুভন শ্রেণীর ভাড়া ১২০ টাকা। তারপর মাত্র ১৫/২০ টাকার রিকশা ভাড়ায় পৌঁছে যান শোলাকিয়া ঈদগাহ।