সাজ্জাদ হোসাঈনের সিঙ্গাপুর জয়!

0
274

জীবিকার তাগিদে অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন ভিনদেশে। কিন্তু ভাষাগত সমস্যার কারণে সেসব দেশে মানিয়ে নিতে বরাবরই নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন প্রবাসীরা। একই সমস্যার মুখোমুখি সিঙ্গাপুরে বসবাসরত প্রবাসীরাও। এমনই একজন হলেন সারোয়ার। তিনি ছিলেন এয়ার কন্ডিশনার টেকনিশিয়ান। কাজের সময় নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক ব্রিফ করা হয়েছিল ইংরেজিতে। ফলে ইংরেজি না জানা সারোয়ার সেসব কিছুই তেমন বুঝতে পারেননি। ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা। গ্যাসের সিলিন্ডার লিক হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। এতে হাতটি পুড়ে যায়। একপর্যায়ে কেটে বাদ দিতে হয় হাতটি। সেখানে আর থাকা হয়নি। দেশে ফিরে আসেন। এভাবেই অসহায়ত্ব জীবন বরণ করে নিতে হয় ইংরেজি না জানার কারণে। এ রকম অনেক সারোয়ার দিনের পর দিন নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অবহেলিত হচ্ছেন নানা সুবিধা থেকে। তাদের সমস্যা সমাধান করতে এগিয়ে এসেছেন সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ সাজ্জাদ হোসেন।

এই তরুণ দীর্ঘদিন অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ইংরেজি ক্লাস পরিচালনা করছেন। ২৩ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেন প্রবাসী শ্রমিকদের ইংরেজি শেখানোর জন্য ‘এসডিআই একাডেমি’ নামে একটি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ পরিচালনা করেন। এখন পর্যন্ত ৫ হাজার প্রবাসী শ্রমিককে ইংরেজি শেখানোর কথা জানিয়েছেন তারা। ৬ বছর পর এবার বাংলাদেশে এসেছেন সাজ্জাদ হোসেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথায় জমে উঠে তার গল্প। শুরুতেই জানালেন এসডিআই একাডেমির গোড়ার গল্প।

তিনি বলেন, ‘২০০৫ সালে আমরা সপরিবারে সিঙ্গাপুরে অভিবাসী হই। স্থানান্তরিত হওয়ার আগে থেকেই বাবা ছিলেন সিঙ্গাপুর প্রবাসী। বাবা একজন প্রকৌশলী। তিনি সেখানে জাহাজ তৈরির কারখানায় তড়িৎ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন।’ সেই সুবাদে মা ফেরদৌস জাহানের সঙ্গে ও ছোট বোন নাজমুন নাহারকে নিয়ে সাজ্জাদ পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে। এর আগে তিনি মতিঝিল মডেল বালক উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন। ছোট্ট সাজ্জাদ তখন ইংরেজি ভালো না জানায় সিঙ্গাপুরের স্কুলগুলোতে এডমিশন টেস্টে কয়েকবার অকৃতকার্য হন। এমনকি পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তির টেস্টেও অকৃতকার্য হন। সাজ্জাদ জানান, ‘পঞ্চম শ্রেণিতে চান্স না পেয়ে চতুর্থ শ্রেণির জন্য চেষ্টা করি, কিন্তু এখানেও ভাগ্য সায় দেয়নি। এর কারণ আমি ইংরেজি প্রশ্নগুলোই বুঝতে পারছিলাম না। আর সবকিছুই আমার ভালো ইংরেজি না জানার কুফল। অকৃতকার্য হওয়ার পরও বাবার অনুরোধে স্কুলের প্রিন্সিপাল চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ দেন। এভাবেই সিঙ্গাপুরে আমার লেখাপড়ার যাত্রা শুরু।’

সাজ্জাদ সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে পরিচিত হন। রাস্তায় বা মসজিদে প্রায়শই তাদের সঙ্গে দেখা এবং কথাবার্তা হতো সাজ্জাদের। সে সময় তিনি জানতে পারলেন শ্রমিকদের অসহায়ত্বের কথা। ইংরেজি না জানায় বঞ্চিত হওয়া নানা গল্পের কথা। সাজ্জাদ বলেন, ‘তাদের অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি সেফটি ব্রিফিং। এটাতে বেশির ভাগ বাংলাদেশি শ্রমিকই ছিল অজ্ঞ। এমনও দেখা যেত, অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে সমস্যাও খুলে বলতে পারত না। এর একটাই কারণ ভালো ইংরেজি না জানা।’ ততদিনে সাজ্জাদ ইংরেজি ভাষা রপ্তও করে ফেলেন। শ্রমিকরা তার কাছে ইংরেজি শিখতে চায়। শুরু হলো ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া। শুরুটা ছিল প্রাইমারি স্কুলের কিছু বই দিয়ে। বাড়ির পাশে পার্কে ক্লাস করাতেন সাজ্জাদ। শিক্ষাদানের মতো এমন মহৎ কাজ সম্পর্কে সাজ্জাদ বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের বসবাস। আমি তাদের সবাইকে ইংরেজি শিক্ষার আওতায় এনে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইলাম না। খেয়াল করলাম তাদের জন্য এমন একটি ইংরেজি শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আসতে হবে, যাতে তারা সহজেই ইংরেজি রপ্ত করতে পারে। যা নিয়ে নিত্যদিনের কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম হবে।’ যেই ভাবা সেই কাজ। দেশি-বিদেশি কয়েকশ ইংরেজি শিক্ষার বই ও শেখানোর পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন সাজ্জাদ। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রতিদিনের ঘটনার তালিকা তৈরি, বিভিন্ন বাংলা শব্দ যা ব্যবহার করে সহজেই মনের ভাব প্রকাশ করা যায় তার ব্যবস্থা করলেন।

এভাবেই একটি সিলেবাস তৈরি করে ফেলেন সাজ্জাদ। এভাবে পার্কের ছোট্ট বেঞ্চটিতে সবার সংকুলান হচ্ছিল না। তখন ‘এসডিআই একাডেমি’ খুলে বসেন। এরই মধ্যে ইংরেজি শেখানোর দুটি বইও প্রকাশিত হয়েছে সাজ্জাদের। ড. ইংলিশ নামের দ্বিতীয় বইটি এ বছর ১৪ মে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের পরপরই এক লাখ প্রবাসী শ্রমিকের মাঝে বইটি বিতরণের জন্য ফান্ড সংগ্রহে নামেন সাজ্জাদ ও তার দল। টি-শার্ট বিক্রি করে এই ফান্ড সংগ্রহ করেন তারা। বইটি সেদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ইংরেজি শিখতে সাহায্য করবে বলে জানান সাজ্জাদ।

দেশে এসে সাজ্জাদ এসডিআই একাডেমির কর্মকাণ্ডগুলোকে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য উপযোগী করে বাংলাদেশে তা প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন।

নিজের দেশ নিয়েও ভাবনার কমতি নেই সাজ্জাদের। এসডিআই একাডেমি দেশে নিয়ে এলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো এতে উপকৃত হবে বলে তিনি মনে করেন। গেল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে সর্বপ্রথম সফল ওয়ার্কশপও সম্পন্ন করেন। সিলেট, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিভাগেও কাজ করবেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, ‘ডিসেম্বর নাগাদ সব বিভাগে একটি করে ওয়ার্কশপ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এ নিয়ে আমরা প্রচুর সাড়াও পাচ্ছি। এর মাধ্যমে মানুষ সহজেই ইংরেজি ভীতি কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। ওয়ার্কশপগুলো ড. ইংলিশ সিরিজের বই দুটি গাইডেন্স হিসেবে কাজ করবে।’

এ ছাড়াও আগামী বছর থেকে পাবলিক স্পিকিং-এর ওপর জোড় দেবেন তিনি। মি. ইংলিশ নামক একটি কম্পিটিশনের আয়োজন করতে চান তারা। বাংলাদেশ থেকে বাছাই করে একজনকে মি. ইংলিস উপাধি দেওয়া হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করাতে সাজ্জাদ গত বছর সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। দিনটি ছিল ৯ আগস্ট। প্রতি বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট সেদেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। গত বছর অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ১৭ আগস্ট। আর সাজ্জাদ ছিলেন আমন্ত্রিত বিশেষ নাগরিক। সাক্ষাৎ পান সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের সঙ্গেও। এ ছাড়াও তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেকগুলো পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৪ সালে আইডিয়াসিনক মোস্ট সোশ্যাল রেসপন্সিবল স্টার্ট-আপ অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। একই বছর মিনিস্ট্রি অব ম্যান পাওয়ার হ্যাকাথন-এ প্রথম রানার আপ হন। পরের বছর ডিবিএস-এনইউএস সোশ্যাল ভেঞ্চার গ্রিন লেন অ্যাওয়ার্ড জয় করেন।

২০১৬ সালে ক্রসিং দ্য চেজম গ্র্যান্ড পুরস্কারও অর্জন করেন। আর এই বছর প্রেসিডেন্ট চ্যালেঞ্জ এ মনোনয়ন পেয়েছেন। এ বছর সিঙ্গাপুরের স্বনামধন্য দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়ার সুযোগ হয়েছে সাজ্জাদের। তিনি পড়ছেন নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। সাজ্জাদের স্বপ্ন পড়াশোনার পাশাপাশি এসডিআই একাডেমির কাজ চালিয়ে যাওয়া।