পাহাড়, নদী, ঝর্ণার সৌন্দর্যে সিলেটের প্রকৃতি পেখম মেলে সব ঋতুতেই। প্রকৃতি প্রেমীদের তাই সিলেট টানে এক মোহনীয় আকর্ষণে। সিলেটের অসংখ্য সৌন্দর্যমন্ডিত স্থানগুলোর মধ্যে একটি হল লালাখাল। নীলাভ-সবুজ জলের মোহনীয় রূপ, তার সাথে দুই পাশের ছোট ছোট চিরহরিৎ টিলা, আর পুরোটা জায়গা জুড়ে মাথার উপর নীলাকাশ। এই বিমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মিলবে লালাখালে।

ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচেই লালাখালের অবস্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের স্থান ও সাতের সৌন্দর্যে ভরপুর এই লালাখাল সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার সন্নিকটে অবস্থিত। এটি সিলেট শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। পাহাড়ে ঘন সবুজ বন, নদী, চা বাগান ও নানা জাতের বৃক্ষের সমাহার লালাখালজুড়ে। ভরা পূর্ণিমায় জ্যোৎস্না ধোয়া নদী, মেঘ পাহাড় আর নদীর মিতালী আপনাকে নিয়ে যাবে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের ভুবনে।

আর যদি পূর্ণিমায় যেতে নাও পারেন তবুও লালাখাল হতাশ করবে না আপনাকে। অসংখ্য তারারা স্বাগত জানাবে আপনাকে। তারা ভরা আকাশের নিচে কাটানো লালাখালের এক রাত আপনার স্মৃতির পাতায় থাকবে চির ভাস্বর।
লালাখাল নদীতে অসংখ্য বাঁকের দেখা মিলবে। প্রতিটি বাকঁই অসম্ভব সুন্দর। এখানে নদী থেকে দূরে পাহাড় দেখা যায়। পাহাড়গুলোকে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন নিজ হাতে থরথরে একের পর এক সাজিয়ে রেখেছে। এখানে পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমা হয়। একটু কাছ থেকেই দেখতে পাবেন, মেঘেরা দল বেঁধে পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে থেমে থাকে। আবার কখনো দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সবার অলক্ষ্যে হারিয়ে যায়।

লালাখালের বিভিন্ন অংশে নীল, সবুজ স্বচ্ছ পানি দেখতে পাবেন। চাইলে তামাবিল অংশের স্বচ্ছ পানির নদীর উপর দিয়ে স্পীড বোট বা নৌকায় লালাখাল যেতে পারেন। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের এ যাত্রা আপনাকে লালাখালের সৌন্দর্যে বাকরূদ্ধ করে রাখবে। অন্তহীন এক মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকবেন নদীর পানির দিকে। কি সুন্দর স্বচ্ছ নীল, একদম পানির নিচের তল পর্যন্ত দেখা যায়।

বলে নেয়া ভাল, চাইলে সারাদিন লালাখালে কাটাতে পারেন, আবার দিনের শেষ ভাগটাও কাটিয়ে আসতে পারেন। লালাখালের সন্ধ্যার আগ মুহূর্তটা অবিস্মরণীয়। ওপরে লালচে আলোর আকাশ, ক্লান্ত সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে। যেন পাহাড় থেকে তিরতির করে সন্ধ্যা নেমে আসছে। ক্রমে সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসে লালাখালের স্বচ্ছ জলে। জ্যোৎস্না রাতে নৌকায় লালাখাল পাড়ি দেয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আপনি চাইলে আগেভাগে বুকিং দিয়ে রাত কাটাতে পারেন লালাখালের পাশে সদ্য গড়ে ওঠা একমাত্র রিসোর্টে।

কখন যাবেন লালাখালে:
লালাখাল বেড়ানোর উপযুক্ত সময় শীতকাল। শীতের সময় আপনি পাবেন চমৎকার জলরাশি। স্রোত থাকেনা তখন। তাই পানি থাকে শান্ত, স্বচ্ছ। একেবারে নদীর তলদেশ দেখা যায়।

কিভাবে যাবেন:
ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ, গাবতলি ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। এ পথে গ্রিন লাইন পরিবহন, এনা পরিবহন, সৌদিয়া এস আলম পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, এনা পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ইউনিক সার্ভিস এর এসি ও নন-এসি বাস চলাচল করে। ভাড়া পড়বে ৪০০ থেকে ১১০০ টাকা।
এছাড়া কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকেও আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেস এ চড়ে যেতে পারেন সিলেটে। সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা।
এরপর সিলেটের ধোপাদিধীর ওসমানী শিশু উদ্যানের বা শিশু পার্কের সামনে থেকে লেগুনা, মাইক্রোবাস বা জাফলংগামী বাসে চড়ে সারিঘাট আসতে হবে। সারিঘাট থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় লালাখাল যেতে পারবেন। যদি নদীপথে লালাখাল যেতে চান তবে এখানে ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন ট্রলার ও নৌকা ভাড়ায় পাবেন। লালাখাল থেকে সিলেট ফেরার জন্য বাস ও লেগুনা পাবেন রাত ৮ টা পর্যন্ত।

কোথায় থাকবেন:
আপনি চাইলে লালাখালের পাড়ে রাত কাটাতে পারেন। নর্দার্ন রিসোর্ট নামে রিসোর্টটির আলাদা পরিবহন ব্যবস্থাও রয়েছে। আরেকটি রিসোর্ট হল রিসোর্ট যা লালাখালের খুব কাছে খাদিমনগরে অবস্থিত। আগে থেকেই বুকিং দিয়ে যাবেন। নাহলে রিসোর্টে রুম নাও মিলতে পারে।
এছাড়া সিলেট শহরে রাত যাপন করে একদিনেও লালখাল ঘুরতে পারেন। সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনটিতে থাকতে পারেন। এসব হোটেলের বেশীরভাগ মাজার রোড, আম্বরখানা এবং জিন্দাবাজারে অবস্থিত। কয়েকটি পরিচিত হোটেল হল- হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা, কায়কোবাদ ইত্যাদি। এছাড়া লালা বাজার এলাকায় কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউজ আছে।

Photo collected fro: Internet

Facebook Comments