বাংলা সনের ইতিবৃত্ত – রাহাত মাহমুদ পলিন

313

বাংলা সনের ইতিবৃত্ত

রাহাত মাহমুদ পলিন

বাংলা পঞ্জিকা হঠাৎ করে বা এমনি এমনি আসেনি। এসেছে একটি বিশেষ সমস্যার সমাধান কল্পে। দিল্লীর সম্রাট মহামতি আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক। তখন বাংলা সনকে বলা হত ‘সন-ই-ইলাহী’। আর যে সমস্যার কারণে বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব, সেটি আর কিছুই না- খাজনা আদায়ের সুবিধা। তখন দিনের হিসাব রাখার জন্য যে দুটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল সেগুলো হল- চান্দ্র মাস বা হিজরি সন আর সৌর বর্ষ। কিন্তু দেখা যায় যে, চান্দ্র মাস সাধারনত ২৯ বা ৩০ দিনে শেষ হয়, ফলে ১২ মাসের চান্দ্র বছর হয় ৩৫৪ দিনে। কিন্ত পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ৩৬৫ দিনে একবার আবর্তন করে বলে সৌর বর্ষ হয় ৩৬৫ দিনে।

বাংলা সনের ইতিবৃত্ত

সম্রাট আকবর এর সময়ে খাজনা আদায় করা হত চান্দ্র মাস বা হিজরি সাল অনুয়ায়ী। চান্দ্র বছর সৌর বছর অপেক্ষা প্রতিবছর ১১ দিন করে কমে যায় বলে খাজনা আদায়ে কৃষকদের খুব অসুবিধা হত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি ইরান থাকে আগত প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজিকে দায়িত্ব প্রদান করেন। এই মহাবিজ্ঞানী পারস্যে প্রচলিত সৌর বর্ষের সাথে সঙ্গতি রেখে এবং প্রচলিত সৌর বর্ষের হিসাবকে সংশোধন করে ‘সন-ই-ইলাহী’ বা ‘ফসলী সন’- এর প্রবর্তন করেন। এরই পরিবর্তিত রূপ হচ্ছে বাংলা পঞ্জিকা। ১৫৮৪ সালের ১১ মার্চ থেকে এই পঞ্জিকা কার্যকর হয় যদিও এর সূচনা ধরা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিক থেকে। দিনটি ছিল ১৫৫৬ সালের ৫ই নভেম্বর।
আর সেই সময়ে মাসের নামগুলো বর্তমানের মতো ছিল না। ফার্সি পঞ্জিকা অনুসারে তখনকার মাসগুলোর নাম ছিলঃ

১। কারওয়ারদিন
২। আর্দি
৩। খোরদাদ
৪। তীর
৫। আমারদাদ
৬। শাহরিয়ার
৭। ভিহিসু
৮। আবান
৯। আজার
১০। দে
১১। বাহমান
১২। ইস্কান্দার মিজ

সন-ই-ইলাহির প্রথম দিনকে বলা হতো তারিখ –ই-ইলাহি। এ দিনকে বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্যের সাথে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হতো। তারিখ –ই-ইলাহির পরিবর্তিত রূপই হচ্ছে আজকের পহেলা বৈশাখ। তাই বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবরকেই পহেলা বৈশাখের প্রবর্তক হিসাবে সম্মানিত করা হয়।
পরবর্তীতে বাংলা মাসের নামগুলো পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করে। বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরন করা হয়েছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। এই নাম সমূহ গৃহীত হয়েছে প্রাচীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রন্থ বরাহমিহির রচিত ‘সূর্যসিধান্ত’ থেকে। বাংলা মাসের নামগুলো এবং তাদের নামের উৎস হল-
• বৈশাখ- বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• জ্যৈষ্ঠ- জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামানুসারে
• আষাঢ়- উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রের নামানুসারে
• শ্রাবণ- শ্রবণা নক্ষত্রের নামানুসারে
• ভাদ্র- পূর্বভাদ্রপদ নক্ষত্রের নামানুসারে
• আশ্বিন- অশ্বিনী নক্ষত্রের নামানুসারে
• কার্তিক- কৃত্তিকা নক্ষত্রের নামানুসারে
• অগ্রহায়ণ- অগ্রাহইনী নক্ষত্রের নামানুসারে (অগ্রহায়ণ মাসের অপর নাম মার্গশীর্ষ যার নামকরণ মৃগশিরা নক্ষত্রের নামানুসারে )
• পৌষ- পুষ্যা নক্ষত্রের নামানুসারে
• মাঘ- মঘা নক্ষত্রের নামানুসারে
• ফাল্গুন- উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নামানুসারে
• চৈত্র- চিত্রা নক্ষত্রের নামানুসারে
সম্রাট আকবরের সময়ে মাসের ৩১ দিনের ৩১ টি আলাদা নাম ছিল। ৩১ টি আলাদা নাম সাধারন মানুষের পক্ষে মনে রাখা কষ্টকর বলে সম্রাট আকবারের দৌহিদ্র সম্রাট শাহজাহান অন্যান্য পঞ্জিকার সাথে সামাঞ্জস্য রাখে সপ্তাহের ৭ দিনের প্রবর্তন করেন।

৭ দিনের নামকরনও করা হয়েছে তারকারাজির উপর ভিত্তি করে।
• শনিবার- শনি গ্রহের নামানুসারে
• রবিবার- সূর্যের নামানুসারে
• সোমবার- হিন্দুদের চন্দ্রদেবতা সোমের নামানুসারে
• মঙ্গলবার- মঙ্গল গ্রহের নামানুসারে
• বুধবার- বুধ গ্রহের নামানুসারে
• বৃহস্পতিবার – বৃহস্পতি গ্রহের নামানুসারে
• শুক্রবার- শুক্র গ্রহের নামানুসারে

পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর নেতৃত্বে একটি কমিটি বাংলা পঞ্জিকা সংশোধনের উদ্দ্যোগ নেয়। পঞ্জিকার নানা সমস্যা নির্ণয় করে তা থেকে উত্তরনের জন্য ঐ কমিটি কয়েকটি প্রস্তাবনা পেশ করেন। বাংলা সনের ব্যাপ্তি ৩৬৫ দিনের। যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে আবর্তনের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে, কিন্তু এ প্রদক্ষিনের প্রকৃত সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। এই ব্যবধান ঘুচাতে গ্রেগ্রিয়ান ক্যালেন্ডার প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যুক্ত করা হয়। ঐ বছরটাকে ‘অধিবর্ষ’ বলা হয়। ব্যতিক্রম হল সেই শতাব্দী যাকে, ৪০০ দ্বারা ভাগ করা যায় না সেটি অধিবর্ষ নয়। সম্পূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা পঞ্জিকায় এই অতিরিক্ত দিন সম্পর্কে আগে কোন ধারণা নেয়া হয়নি। এই সমস্যা গুলো দূর করার জন্য ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ কমিটি কতগুলো প্রস্তাব পেশ করে। এগুলো হল-
*বছরের প্রথম ৫ মাস অর্থাৎ বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের
*বাকি মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন থেকে চৈত্র হবে ৩০ দিনের
*প্রতি চতুর্থ বছরে ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের।

বাংলা একাডেমী সরকারীভাবে এই সংশোধিত বাংলা মাসের হিসাব গ্রহন করলেও ভারতের পশ্চিম বাংলায় পুরনো বাংলা সনের হিসাবই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গোড়া হিন্দুরাও ধর্মীয় ক্ষেত্রে পুরনো বাংলা সনের হিসাবই ব্যবহার করে।
এবার চমকে দেয়ার মত একটা প্রশ্ন। বাংলা সনের প্রবর্তন সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণ করার বছর থেকে, অর্থাৎ ১৫৫৬ সাল থেকে। আর বর্তমানে ২০১৪ সাল। তাহলে সেই হিসাবে ২০১৪ সালে আমাদের ২০১৪-১৫৫৬ = ৪৫৮ বঙ্গাব্দ পালন করার কথা। কিন্তু এবারে আমরা ১৪২১ বঙ্গাব্দ পালন করব! কেন এমনটা হল? হিসাবে কি তাহলে কোন ভুল হলো ?

না, কোন ভুল হয়নি। প্রশ্নটার উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসে। সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণ করার হিজরি সাল ছিল ৯৬৩। আর সে বছর থেকে বাংলা সন গণনা শুরু করার কারণে সেই বছরকে ৯৬৩ সাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ বাংলা সন গণনা করা শুরুই হয়েছে ৯৬৩ সাল থেকে। তারপর ৪৫৮ বছর অতিবাহিত হয়েছে। ৯৬৩ + ৪৫৮ = ১৪২১ বঙ্গাব্দ।
এবার হিসাব মিললো তো ???

লেখকঃ নাট্যকার, প্রবন্ধকার, কলামিস্ট, বি.এসসি প্রকৌশলী (অধ্যয়নরত)
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।