কাপাসিয়া উপজেলা’য় ভ্রমন খুটিনাটি – গাজীপুর

3292

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা’য় ভ্রমন খুটিনাটি!

ঢাকা শহরের কোলাহলযুক্ত যান-জটময় উচু অট্রালিকার চার দেয়ালে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসাটাই স্বাভাবিক।। এরকম একঘেয়েমী অবস্হায় রাজ্যের ব্যস্ততা থেকে আপনার মনকে চাঙা করতে ছুটির দিন বাদে হতে অন্যদিনে কোন সময় নেই এটাও অস্বাভাবিক কিছু না! ভাবছেন একদিন ঢাকার কোলাহল কে পেছনে ফেলে গ্রামীন কোন জনপদে প্রকৃতির ভেতরে হারিয়ে যেতে পারবেন এমন জায়গা কোথায় গেলে ভালো পাবো?? হুম আপনি একদিনেই ঘুরে আসতে পারবেন এরকম জায়গা ঢাকার কাছাকাছি তো অনেক ই আছে। আমি আজ পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি এমনই এক প্রাকৃতিক স্বর্গের সাথে যেখানে নদী, পুরোনো ঐতিহাসিক স্হাপনা আর মনোলোভা খাবার তো আছেই সাথে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের গ্রাম যা আপনার মন কে চাঙ্গা করে দেবে অনায়াসেই।।
ঢাকা থেকে ৫৭ কি.মি. দূরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ এর স্মৃতিবিজরিত জন্মভূমি ভাওয়ালের অরন্যরাজ্য গাজীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী সবুজ শ্যামল কাপাসিয়া উপজেলা।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা’য় ভ্রমন খুটিনাটি

কাপাসিয়া নিয়ে কিছু কথাঃ
বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাচীনতম জনপদের নাম কাপাসিয়া। এ দেশের প্রাচীন ভূখন্ডগুলোর অন্তর্ভুক্ত কাপাসিয়ার সমগ্র অঞ্চল। এ অঞ্চলের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। মুসলিমপূর্ব যুগ হতে সমগ্র মুসলিম শাসন আমলে উত্তরে টোক থেকে শুরু করে পূর্বে কিশোরগঞ্জ ও দক্ষিণে সোনারগাঁও পর্যন্ত এলাকা জুড়ে উৎপাদিত হতো ইতিহাস বিখ্যাত কিংবদন্তির মসলিন কাপড়। সেই অতি সুক্ষ্ম মসলিন বস্ত্রের জন্য মিহি আঁশের কার্পাস তুলা উৎপাদিত হতো শীতলক্ষ্যা নদীর উভয় তীরে। সংস্কৃত ও হিব্রু ভাষায় তুলার অপর নাম কার্পাস। পার্সী ভাষায় কারবস, বাংলা ও হিন্দী ভাষায় কাপাস। কাপাসের গাছকে বলা হয় কাপাসি। এই কার্পাস শব্দ হতে কাপাসিয়ার নামকরণ করা হয়েছে বলে অধিকাংশ গবেষকগণ মনে করেন। খ্রিষ্টপূর্ব যুগ হতে এ অঞ্চলে কার্পাস তুলার ব্যাপক চাষাবাদ ছিল। কাপাসিয়া ছিল মসলিন উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য একটি বৃহৎ বাণিজ্য কেন্দ্র। কার্পাস ও রেশমী বস্ত্র প্রাচীন বাংলার অর্থনীতিকে করেছিলো শক্তিশালী। কাপাসিয়ার ভূমি ও আবহাওয়া তুলা উৎপন্ন হওয়ার বেশ উপযোগী ছিল। পর্যাপ্ত পরিমানে কার্পাস তুলা উৎপন্ন হওয়ায় এই স্থানের নাম কাপাসিয়া হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

কাপাসিয়া উপজেলায় রয়েছে অনেকগুলো দর্শনীয় স্হান এর মধ্যে অন্যতম হলো তাজউদ্দীন আহমেদ এর স্মৃতিবিজরিত বাড়ি, রুপালী পানির শীতল শীতলক্ষ্যা নদী ও ঐতিহ্যবাহী টোক নগরী।

টোক বাজার, এখানে রয়েছে শাহ্ গরীবুল্লার মাজার, পাশে আছে মহামতি ইশা খাঁর স্মৃতি বিজরিত এগারোসিন্ধুর এটা অবশ্য পড়েছে কিশোরগঞ্জ পাকুন্দিয়া থানায়। (টোক সীমানার শেষ ভাগে বিদায় বোনাস হিসেবে দেখা হয়ে যাবে এই ঐতিহাসিক স্হাপনাটি। রয়েছে দুটি পুরনো মসজিদ যা ইশা খাঁর আমলে দুজন দরবেশ তৈরী করেন। নয়নের বাজারের মালাই চা। আর যেটার নামডাকে কাপাসিয়ার টোক বাজারেরর নাম ছড়িয়ে গেছে গোটা বাংলাদেশের ভ্রমনপিপাসু আর খাদকদের কাছে তা হলো তোতা মিয়ার হোটেল নিরিবিলি পুথি, যেখানে প্রায় ৭০ রকমের ভর্তা বাজির ও ৩০ রকমের তরকারীর সমাহারে সেরে নেওয়া যায় ভোজনরসিকতা। পাশেই রয়েছে আরেক জিনিস ‘পান’ স্বপন ভাইয়ের ভালোবাসার পান! যা দেখলে আপনি না খেয়ে আসবেন না, আর ভোজনেরও পূর্নতা পাবে না !

আরো একটা মজাদার ব্যাপার হলো এখানে গেলে আপনি খুজে পাবেন গাজীপুরের কাপাসিয়া, কিশোরগন্জের পাকুন্দিয়া আর ময়মনসিংয়ের গফরগাঁও এই তিন জেলার মিলনস্হল যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রক্ষ্রপুত্র নদ।

ভ্রমন কথাঃ
এত কিছু একসাথে না গিয়ে পারা যায় না..
অনেক দিন ধরেই যাব যাব করেও যাওয়া হচ্ছিলো না ব্যাস্ততার কারনে। কিন্তু ব্যস্ততার কারনে তো আর মন কে দমিয়ে রাখা যায় না তাই সময় বের করে সেদিন যাওয়া হয়েছিলো টোক বাজার্।
৭ টায় রওনা শুরু হলো, চৌরাস্তা থেকে যেতে ১:৩০ ঘনটা লাগবে। কাপাসিয়া সদরে ফকির মজনু শাহ্ সেতু দিয়ে পার হতে যেত হবে টোক বাজার শুরুতেই শীতলক্ষ্যা নদীর শীতল উষ্মতায় কাপাসিয়া উপজেলা আপনাকে বরন করে নেবে। যদি আপনি তাজউদ্দীন সাহেবের বাড়ি হয়ে যেত চান তাহলে আপনাকে আমরাইদ বাজার নেমে বাম দিকে রায়েদ দরদরিয়ার টমটম যোগে যেতে হবে। আমরা আমরাইদ বাজার নেমে সকালের নাস্তা করে নিলাম। সেখান থেকে টমটমে করে সোজা দরদরিয়া বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর স্মৃতিবিজরিত বাড়ি।

পাশেই শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাপাঝাপির আনন্দ সেরে ১১:৩০ এ আবারো টমটমে করে আমরাইদ বাজার, সেখান থেকে বাসে উঠে সোজা নয়নের বাজার পৌছতে ১ টা, সরাসরি বাবুর্চী তোতা মিয়ার খাবার রাজ্য হোটেল নিরিবিলিতে। আগে এক পলক দেখে নিন চারপাশটা ভালোই নিরিবিলি পরিবেশে হোটেল নিরিবিলি সুঘ্রান ছড়িয়ে যাচ্ছে অবিরত!! কি নেই সেখানে?? ভাবা যায় প্রায় ১০০ টা পদের মজাদার খাবার!!

খাবার আগে একবার গুণে দেখার চেষ্টা করতে পারেন !!!
বিভিন্ন রকম ভর্তা ভাজি শাক সবজি মাছ গোস্ত আর আচার এ যেন খাবারের বিরাট হাট !!!
কবুতরের মাংশ, খাশির মাংশ, হাসের মাংশ, মুরগীর মাংশ,
বাতাসী মাছ, বাইন মাছ, ইলিশ মাছ, শোল মাছ, রুই মাছ, চিংড়ি মাছ, গুড়া মাছ, শুটকি মাছ, মুলা শাক, পাট শাক, লাল শাক, পুই শাক, সর্ষে শাক, শুটকি ভর্তা, মরিচ ভর্তা, ডিম ভর্তা, আলু ভর্তা, সর্ষে ভর্তা, কালো জিরা ভর্তা, মাসকালাই, মশুর ডাল, মুগ ডাল,মিক্সড সবজি, ঝিংগা, চিচিংগা, পটল, আলুসীম, করলা, বড়ই আচার, জলপাই আচার, মিক্সড আচার!! দই !!

আমি আবার খাদ্যপ্রেমীক কোথাও গেলে সেখানকার স্পেশাল খাবার না খেতে পারলে আমার ঘুরাঘুরি পূর্নতা পায় না !! যাই হোক পেট ভরে খেয়ে শান্তির ঢেকুর তুললাম !! খাবারের স্বাদ আর মান নিয়ে বলব অসাধারন !! তোতা মিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়েই স্বপন ভাইয়ের ভালোবাসার মিষ্টি পান প্রায় ৬০ রকমের মজাদার সুগন্ধি মশলা দিয়ে বানানো এই পান বানানো পুরোটাই দেখা হলো !! পান বানানো দেখতে ও মজা লাগে !! খেতে তো অমৃত!! বিছানায় আরাম করার ব্যবস্হা না থাকলেও পাশেই আছে ব্ক্ষ্রপুত্র নদ আর ঈশা খা সেতু। চলে এলাম নদীর ধারে কিছু সময় প্রকৃতিস্নান করে ঘুরে দেখা হলো ঈসা খাঁর বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দু আর ইতিহাসের বিখ্যাত ঈশা খাঁ-মানসিংহের যুদ্ধ।

এই যুদ্ধ নিয়ে ইতিহাস থেকে যা জানা যায়-
১৫৯৬ সালে বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর সঙ্গে মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধ হয় ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলে বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার সর্ব দক্ষিণ প্রান্তের টাঙ্গার গ্রামে। সে সময় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে ছিল রাজা মানসিংহের রাজধানী টোক নগরী। এটির অবস্থান গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে। রাজা মানসিংহ ১৫৯৫ সালে রাজস্থান থেকে তার রাজধানী টোক নগরীতে সরিয়ে আনেন। ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে ছিল টাঙ্গাব গ্রাম ও টোক নগর। ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পাড়ে ছিল ঈসা খাঁর বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দু।

ইতিহাস মতে, ঈসা খাঁর অনুপস্থিতিতে মানসিংহ এগারসিন্দু আক্রমণ করেন। সংবাদ পেয়ে দুর্গ রক্ষায় ছুটে আসেন। কিন্তু তার সৈন্যরা এতোই ক্লান্ত ছিল যে, তারা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ঈসা খাঁ মানসিংহকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান করেন। মানসিংহ এ প্রস্তাবে রাজি হন। যুদ্ধে এক পর্যায়ে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাকে আঘাত না করে নিজের তরবারি মানসিংহকে দেন কিন্তু মানসিংহ তরবারি না নিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে আসেন। ঈসা খাঁ তখন মানসিংহকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেন। কিন্তু মানসিংহ তা গ্রহণ না করে ঈসা খাঁকে আলিঙ্গন করেন। তার সাহস ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। মানসিংহ ঈসা খাঁকে নিয়ে সম্রাট আকবরের দরবারে গেলে তিনি ঈসা খাঁকে ২২ পরগনার শাসক নিয়োগ করেন ও তাকে মসনদ-ই আলা উপাধিতে ভূষিত করে স্বদেশে ফেরত পাঠান।

বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্র দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেতে রুপ নিয়েছে । দেখা হলো হযরত শেখ মাহমুদ শাহ্ মসজিদ, হযরত শেখ শাদী মসজিদ। সব কিছু দেখে বিকাল বিকাল নয়নের বাজারের মালাই চা খেয়ে গাড়ীতে চেপে ইট পাথরের শক্ত মায়ায় ঘেরা কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে আবারো সেই ঢাকার চিরচেনা সহ্যকর জ্যামের ভেতর বসে বসে আবারো সেই আক্ষেপ…. কবে আবার হারিয়ে যাবো প্রকৃতির মাঝে। যেখানে থাকবে না কোন কোলাহল, হিংসা, বাড়াবাড়ি !!!
সুন্দর হোক সবার জীবন,
সবুজের মাঝে পবিত্র থাকুক মন!!!

আপনি কাপাসিয়ার গিয়ে কি কি দেখবেন? কীভাবে সময় কাটাবেন??

  • বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ এর বসত বাড়ি।
    শীতলক্ষ্যা নদী
  • গাজীপুরের কাপাসিয়া, কিশোরগন্জের পাকুন্দিয়া আর ময়মনসিংয়ের গফরগাঁও এই তিন জেলার মিলনস্থল যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রক্ষ্রপুত্র নদ।
  • ধাঁধার চর (ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যাকে মেলানো এই অদ্ভুত চর)
  • রূপনগর পালকি
  • শীতলক্ষ্যা ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদরে সঙ্গমস্হল শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল +নৌকা ভ্রমন
  • আলৌকিক ভাবে গড়ে উঠা সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী জামে মসজিদ
  • আম কাঠাঁলের মৌসুমে পিওর আম কাঠাঁল তো পাবেনই।
  • আখের মিলে আখ থেকে গুড় বানানোর প্রক্রিয়া দেখতে পারবেন ভাগ্য ভালো থাকলে।

খাবার দাবারঃ

  • প্রায় ১০০ পদের খাবারের সমারোহের হোটেল নিরিবিলিতে দুপুরের খাবার
  • টোক নয়নবজোরের মালাই চা
  • মিষ্টি পান

ভ্রমনপিপাসুরা একদিনের ভ্রমনে কিভাবে যাবেন?
ভোর বেলাতেই যাত্রা শুরু করা ভালো তাহলে রাতের মধ্যেই মোটামুটি ঘুরে ফিরে চলে আসতে পারবেন। ঢাকা থেকে কাপাসিয়া যেতে লাগবে ২:০০-২:৩০ ঘন্টা ট্রাফিক ব্যতীত ভোর সকালে। গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রভাতী বনশ্রী পরিবহন অথবা মহাথালী বাসস্ট্যান্ড থেকে অনন্যা পরিবহন, অনন্যা ক্ল্যাসিক পরিবহন, জলসিড়ি পরিবহন, বন্যা পরিবহনে করে কাপাসিয়া হয়ে টোক নয়ন বাজারে যেতে হবে। জনপ্রতি ১১০-১২০ টাকা ভাড়া লাগবে। যেহেতু দূরের যাত্রা তাই একটু আরামে যেতে চাইলে মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসে উঠাই উত্তম। এছাড়াও গাজীপুর জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে রাজদূত বা পথের সাথী পরিবহনের গাড়ি দিয়ে আপনি চলে যেতে পারবেন কাপাসিয়া।
সবুজ শ্যামল কাপাসিয়া উপজেলাকে ভ্রমন পিপাসু মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং কাপাসিয়া উপজেলাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিনত করতে আমরা নিজেদের কাছে অঙ্গিকারাবদ্ধ।