জাগ্রত চৌরঙ্গী- মুক্তিযুব্ধের স্মৃতিতে নির্মান করা বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর্য

156

জাগ্রত চৌরঙ্গী- মুক্তিযুব্ধের স্মৃতিতে নির্মান করা বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর্য

গাজীপুর চৌরাস্তা গাজীপুরের এক প্রান কেন্দ্র বলা যায় । যার এই জায়গাটিকে চেনেন তারা সবাই জানে এইখানে একটি মূর্তি বা ভাস্কর্য রয়েছে । কিন্তু অনেকেই এর পিছনের ঘটনা জানেনা । এই ভাস্কর্যটি কিসের বা কেন এই ভাস্কর্য টি তৈরি হয়েছে । এমন কি অনেক গাজীপুরবাসীই বলতে পারবে না । কেন এটিকে এখানে স্থাপন করা হয়েছে ।

বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর্য “জাগ্রত চৌরঙ্গী”

গাজীপুর চৌরাস্তায় যে ভাস্কর্য টি রয়েছে তার নাম ” জাগ্রত চৌরঙ্গী ” । গাজীপুরের জাগ্রত চৌরঙ্গী ভাস্কর্যটি বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর্য যা মুক্তিযুব্ধের স্মৃতিতে নির্মান করা হয় । এটি ১৯৭১ সালের গাজীপুরের সশস্ত্র যুব্ধের স্বরনে নির্মান করা হয় । এটির আকার ভিত বা বেদিসহ জাগ্রত চৌরঙ্গীর উচ্চতা ৪২ ফুট ২ ইঞ্চি। ২৪ ফুট ৫ ইঞ্চি ভিত বা বেদির ওপর মূল ভাস্কর্যের ডান হাতে গ্রেনেড ও বাঁ হাতে রাইফেল। কংক্রিট, গ্রে সিমেন্ট, হোয়াইট সিমেন্ট ইত্যাদি দিয়ে ঢালাই করে নির্মিত এ ভাস্কর্যটিতে ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ নম্বর সেক্টরের ১০০ জন ও ১১ নম্বর সেক্টরের ১০৭ জন শহীদ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম উৎকীর্ণ করা আছে। শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক যিনি মতিঝিল শাপলা চত্বরের নির্মাতা তিনি এটি নির্মান করেন

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষনের পর পুরোদেশ এ আন্দোলন শুরু হয় । ততকালিন সরকার পূর্ব পাকিস্তানে তাদের সামরিক শক্তি বাড়াতে থাকে । এর একটি অংশ হিসেবে ১৯ মার্চ শুক্রবার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাচটি ভ্যান জয়দেবপুর সেনা ছাউনিতে পৌছে । তারা ছাউনিতে পৌঁছার পর পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীর একটি দলকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর পুরো গাজীপুরে ছড়িয়ে পরে । বিদ্যুত স্ফুলিঙ্গের মত করে জনগন ঝাপিয়ে পরে সংঘর্ষে । তারা গাজীপুরে ঢোকা বা বের হওয়ার রাস্তা গাছের গুড়ি ফেলে বন্ধ করে দেয় । পাকিস্তানি বাহিনী ছিল ভারী অস্ত্র সস্ত্র সজ্জিত আর অপরদিকে মাত্র তিনটি বন্ধুক দিয়ে গাজীপুরবাসী লড়াই শুরু করে । পাকিস্তানী সৈন্যরা জবাধা প্রাপ্ত হয়ে নির্বিচারে গুলি শুরু করে । এতে করে হুরমত উল্ল্যা(১৪), মনু সহ প্রায় ২০ জন শহীদ হন এবং ১৬ জন আহত হন । কিন্তু পাকিস্তানিরা তা অস্বীকার করে তারা বলে ৩ জন নিহত আর ৫ জন আহত হয় । পৌনে ৪টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত গুলি চলে এবং পরে ৬ টা থেকে সন্ধ্যাকালিন আইন জারি করা হয় ।

এটা বলা যায় যে স্বাধীনতার প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন গাজীপুর থেকেই শুরু হয় । গাজীপুরের বাসীন্দা হিসেবে গর্ব হচ্ছে যে স্বাধীনতার প্রথম সশস্ত্র যুব্ধ এখানেই শুরু হয়েছিল যা পরবর্তিতে পুরো দেশে ছড়িয়ে পরে । তার ই স্মৃতি এই ভাস্কর্যটি ।
এটি মুক্তি যুব্ধের প্রথম সশস্ত্র আন্দোলনের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এতে । মুক্তিযুব্ধের পর দেশে অনেক পরিবর্তন হয় । কিন্তু মেজর জেনারেল (অব) আমীন তিনি তখন আহম্মদ চৌধুরী এটি তৈরির উদ্যোগ নেন । তিনি এবং ভাস্কর আব্দুর রাজ্জাক এটি নির্মানে অগ্রামী ভূমিকা পালন করেন । তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন ভাস্কর হামিদুজ্জামান এবং প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এটির নির্মানে এগিয়ে আসেন । এটি আর্ট কলেজ যা বর্তমানে চারুকলা ইনস্টিটিউট এ নির্মান করা হয় । ঢাকায় তখন একটি মাত্র ক্রেন ছিল । সেটি দিয়ে উঠিয়ে একে জয়দেবপুর আনা হয় । এতে দুই দিন সময় লাগে । আনার পর দেখা যায় যে হাটুর কাছে একটু ফাটলের মত দেখা যায় তাই আমীন স্যার এর খুতখুত লাগে । তাছাড়া মূর্তিটির এক হাতে মশাল আর এক হাতে বন্দুক ছিল । মশাল ছিল জাসদের প্রতিক তাই সেটাকে জয়দেবপুরের রাজবাড়িতে স্থাপন করা হয় । কারন সবাই ভাবতে পারে আমীন আহম্মদ চৌধুরী জাসদের সাপোর্ট করেন । কিন্তু বর্তমানে আমরা যেটি কে দেখি সেটা আমীন স্যার ই তৈরি করিয়েছিলেন এক বছর সময় নিয়ে । তবে শুধু মশালের বদলে গ্রেনেড দিয়ে দিয়েছিলেন । তারপর ১৯৭৩ এটি স্থাপন সম্পন্ন হয় গাজীপুর ,চৌরাস্তায় ।

আমীন স্যার তখন জয়দেবপুরের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ছিলেন । তার একার প্রচেষ্টায় আজ জাগ্রত চৌরঙ্গী প্রতিষ্ঠত । উদ্বোধন নিয়েও আছে আর এক কাহিনী । এটি স্থাপনের পর কে উদ্বোধন করবে সেটা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা কল্পনা । কে করতে পারে ,কে করতে পারে । আমীন স্যারের ইচ্ছে ছিল বঙ্গবন্ধু উপস্থিতিতে শহীদ হুরমদের মাকে দিয়ে উদ্বোধন করাবেন । কিন্তু প্রভাবশালী অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে । অনেকে আমীন স্যার কে উদ্বোধন করতে বললেন । কিন্তু আমীন স্যার বিনয়ের সাথে না করে দিলেন । তাই আজও এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি । আমীন স্যার মারা যান ২০১৩ এর ১৯ এপ্রিল । কিন্তু তিনি হয়ত এই কষ্টটা বয়ে বেড়িয়েছিলেন যে আজও স্বাধীনতার প্রথম ভাস্কর্যটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি । আর আমরা এটার কি অবস্থা করছি তা দেখেই বুঝা যায় । আসলে স্বাধীনতার যত গুলো স্তম্ভ আছে সব গুলোর অবস্থা একই রকম হয় রাজনীতি বিদের পোষ্টার বা সিনেমার পোষ্টার লাগিয়ে এর সম্মানটাই নষ্ট করে ফেলেছে । কারন এর সঠিক ইতিহাস আমরা জানি না ।
ইতিহাসকে জানার চেষ্টা করুন । আর স্বাধীনতার সম্মান করুন ।

লিখেছেন- অপু দ্যা গ্রেট