নদীর মাঝে ধাঁধার চর – কাপাসিয়া

1218

নদীর মাঝে ধাঁধার চর – কাপাসিয়া

বিন্দু বিন্দু বালি জমে হঠাৎ জেগে ওঠা এক চরের গল্প। ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যাকে মেলানো এই অদ্ভুত চরের গল্প শোনাচ্ছেন মো. মনির হোসেন

নদীর প্রতি ঘনিষ্ঠতা ও মায়া বাড়াতেই নদী পরিব্রাজক দলের নদীর পানে যাত্রা। বলা হয়, বাংলাদেশকে প্রায় আড়াই প্যাঁচে আবৃত করে আছে ব্রহ্মপুত্র নদ। বাংলাদেশের দীর্ঘতম এই নদের একটি শাখা নদী শীতলক্ষ্যা। এটি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার সাত-আট কিলোমিটার পূর্ব দিয়ে দক্ষিণমুখী হয়ে কাপাসিয়া উপজেলা শহরের মধ্য দিয়ে কালীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদরের ধলেশ্বরী নদীতে মিলিত হয়েছে। শীতলক্ষ্যার খ্যাতি পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানির জন্য।

নদীর মাঝে ধাঁধার চর

এখানেই রয়েছে নৌকা আকৃতির এক বিশাল চর, নাম ধাঁধার চর। অনেকে বলে মাঝের চর। কারণ এ চরটি লাখপুর, তারাগঞ্জ, রানীগঞ্জ ও চরসিন্দুরের মাঝখানে অবস্থিত। শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে জেগে ওঠা এ চরটির আয়তন প্রায় আড়াইশ’ একর। দূর থেকে দেখলে এ চরটিকে অনেকটা সেন্টমার্টিনের মতো মনে হয়, কারও কারও মনে হতে পারে এ যেন ডুবে যাওয়া টাইটানিকের জেগে ওঠা। ধাঁধার চরের অবস্থানটাও বেশ ধাঁধাঁ লাগানো। চরের উত্তর-দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ। দু’ দিকে দুই থানা_ কাপাসিয়া ও শিবপুর। দু’পাশে দুই জেলা গাজীপুর ও নরসিংদী। বর্ষা মৌসুমে দুটি নদীই থাকে গর্ভবতী। জলে টইটম্বুর। শীতকালে এটি হয়ে ওঠে আরও মনোরম, আরও মনোলোভা। স্থানীয় তারাগঞ্জ, লাখপুর, রানীগঞ্জ ও চরসিন্দুরের মাঝখানে এ চরকে দেখলে মনে হয় ভাসমান টাইটানিক গ্রাম। এ চরটি লম্বায় ৪ কিলোমিটার, চওড়ায় বর্ষায় আধা কিলোমিটার। শীতকালে আরও বিস্তৃত হয়।

আনুমানিক ২০০ বছর আগে জেগে ওঠা এই চর স্থানীয়রা কেউ কেউ বলেন মাঝের চর। কারণ এটি ব্রহ্মপুত্র নদ ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। একসময় এই চরের নাম-নিশানা ছিল না। ছিল বহমান নদী। তারপর আস্তে আস্তে বিন্দু বিন্দু বালুকণা জমতে জমতে বেলেমাটিতে পূর্ণ হয়ে একসময় যখন চর জেগে ওঠে, তখন স্থানীয় লোকজন এটি দেখে ধাঁধায় পড়ে যান। সেই থেকে এর নাম ধাঁধার চর।

নদীর মাঝে ধাঁধার চর

এ চরের ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। জেগে ওঠা চরের মালিকানা নিয়ে ভাওয়ালের রাজা এবং বারভূঁইয়াদের এক ভূঁইয়া মহেষ উদ্দীনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শেষে মালিকানা পেয়ে যান ভাওয়ালের রাজা। তারপর স্থানীয় হিন্দু কৃষকরা ভাওয়ালের রাজাকে খাজনা দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। ১৮১৬-১৮১৯ সালে ব্রিটিশরা এর জরিপ করে এবং খাজনা প্রদানের মাধ্যমে হিন্দু কৃষকদের বৈধ মালিকানা প্রদান করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর হিন্দুরা চরের জমি স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে ভারতে পাড়ি জমান। বর্তমানে পুরো চরের মালিকানা মুসলিম কৃষকদের হাতে। চরের মাটি খুবই উর্বর। এখানে রোপণ করলে হয় না, এমন কোনো ফল-ফসল বাংলাদেশে নেই। একসময় চরে প্রচুর আখ হতো। এখন সবচেয়ে বেশি আলুর চাষাবাদ হয়। চরের মাটির তলায় বা মাটির ওপরে যা রোপণ করা হোক না কেন তা অতিফলনশীল এবং সারবিহীন ও সুস্বাদু। ১৯৬০, ১৯৮৮, ১৯৯৮ সালের বন্যায় এ চরটি তলিয়ে গিয়েছিল। ১৯৬০ সালের বন্যার পর চরে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায়। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি আরও বাড়তে থাকে। এসব না-জানা তথ্য জানালেন স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ এলাকাবাসী।

বিকেলের চরটি বড়ই মনোরম। তখন চরের লম্বা গাছগুলো পাতা নেড়ে সন্ধ্যাকে আমন্ত্রণ জানায়। টকটকে লাল সূর্য শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের গভীরে রাতের জন্য ঘুমাতে যাচ্ছে। হয়তো গভীর রাতে আকাশ ভেঙে নামবে ধবল জোছনা। সকালবেলা ঘুম থেকে চরকে নতুন জামা পরিয়ে দেবেন। উদিত সূর্যের আলোকে আলোকিত হয়ে উঠবে ধাঁধার চর। ঝিরঝিরে বাতাস। উড়ন্ত পাখির কলকাকলি। মাঝির আকুল করা গান। চরের বুক দিয়ে হাঁটলে কল্পনা করা যাবে না এটি একটি চর, যার দু’পাশে রাক্ষসী দুই নদী। মনে হবে মাসি-পিসির ঘুম পাড়ানো শান্ত-সি্নগ্ধ একটি গ্রাম। তবে চরকে নিয়ে স্থানীয়রা খুবই উচ্ছ্বসিত। শীত এবং বর্ষা মৌসুম ছাড়াও ঈদে চরে বিপুল লোক সমাগম ঘটে। আবার কেউ কেউ বন্ধু-বান্ধবের জন্মবার্ষিকীও এখানে পালন করেন। ধাঁধার চর দেখতে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা দূরদূরান্ত থেকে। এই চরটি যদি পর্যটন করপোরেশনের আওতায় আনা হয়, তাহলে পর্যটকরা এটি দেখে মুগ্ধ হবেন। আর সরকারের তহবিলে জমা পড়বে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। সত্যিকার অর্থেই এটি দেখার মতো একটি জায়গা।

নদীর মাঝে ধাঁধার চর

তখন ফাল্গুন মাস তৃপ্তির জন্য এবং একঘেয়েমি জীবনে কিছুটা পরিবর্তনের জন্য বেড়াতে যেতে পারেন কাপাসিয়ার শীতলক্ষ্যার নদীর বুকে জেগে ওঠা এই চরে। প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান। অপরূপ ও অনাবিল এ সৌন্দর্য কখনও বর্ণনা করা যায় না। এ সৌন্দর্য অবলোকন করলে মনে হয় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মনের সব দুঃখ-যন্ত্রণা দূর করে দেয়। আর এই অপরূপ সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করে রাখার মজাই আলাদা। এখানকার নৌকা দিয়ে চরের চারপাশ ভ্রমণ, চরে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পেয়ারা বাগান, কলাবাগান, সারি সারি তালগাছ, জামগাছ, কুল বাগান ও নানা প্রজাতির অসংখ্য ঔষধিগাছ দেখতে পাবেন। পাশেই নদীতে থৈ থৈ জলরাশি। উপরে দিগন্তবিস্তৃত খোলা আকাশ। মাছরাঙা পাখির হুটহাট জলচুম্বন, পানকৌড়ির লুকোচুরি। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখতে পাবেন ঘোমটা দেওয়া শুশুক। জলের সাদা ফেনা থেকে আছাড় খাচ্ছে প্রায় আড়াইশ’ একর জমি নিয়ে গভীর জলের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ধাঁধার চরের বুক। চরটির পূর্ব দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বটতলায় আছে ঐতিহাসিক ঘাঘাট। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন অষ্টমী তিথিতে এ ঘাটে পুণ্যস্নান করেন। এটি চলে আসছে সেই ভাওয়াল রাজার আমল থেকে এবং তা এখনও চলছে। এ চরটি শ্যুটিং স্পট হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে বহুবার। শাবনাজ-নাঈম অভিনীত বিষের বাঁশি চলচ্চিত্রটির অধিকাংশ দৃশ্য এখানেই ধারণ করা হয়। এ চরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নদী পরিব্রাজক দলকে মুগ্ধ করেছে। আশা করি, আপনাকেও মুগ্ধ করবে।

সংগ্রহ করা হয়েছে দৈনিক সমকাল পত্রিকা থেকে।