কাপাসিয়ার কৃতি সন্তান আ স ম হান্নান শাহ্

1825

কনজরে আ স ম হান্নান শাহর বর্ণাঢ্য জীবন!

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আবু সাইদ মতিউল (আ স ম ) হান্নান শাহ গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ার উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামে ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফকির আবদুল মান্নান ১৯৬৫-৬৮ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার ছোট ভাই শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন।

আ স ম হান্নান শাহ্

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ্ ছিলেন বৃটিশ বিরোধী “ফকির আন্দোলন” এর পথিকৃৎ ফকির মজনু শাহ্ এর সুযোগ্য চতুর্থ প্রজন্ম, অর্খাৎ ফকির আন্দোলনের নেতা মজনু শাহ্ হলেন হান্নান শাহ্ এর পিতার দাদা।

হান্নান শাহ ১৯৫৬ সালে ঢাকার সেন্টগ্রেগরি স্কুল থেকে মেট্রোকোলেশন পাস এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬০ সালে বিএসসি অধ্যয়ণকালে পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে সামরিক একাডেমি কাকুল থেকে কমিশন প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে থাকাকালীন সময়ে এরশাদ সরকার বাধ্যতামূলক তাকে অবসর প্রদান করেন।তার ছোট ভাই শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রথম “এটর্নী জেনারেল” ফকির শাহাবুদ্দিন এর চাচাতো ভাই, মুসলিম লীগ নেতা ও প্রাদেশিক সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ফকির আঃ মান্নান এর সুযোগ্য সন্তান এবং সাবেক বিচারপতি শাহ্ আবু নাইম মোঃ মোমিনুর রহমান এর ভাই(জৈষ্টতা লঙ্গনের কারনে প্রধান বিচারপতি না হওয়ায় পদত্যাগকারী)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিগ্রেড কমান্ডার, চট্টগ্রামের মিলিটারি একাডেমির কমান্ডেন্ট, যশোর স্কুল অব ইনফ্রেন্টি অ্যান্ড টেকটিক্স এর প্রধান প্রশিক্ষক, পাকিস্তানের কোয়েটার আর্মি কলেজ অব ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিংক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রশিক্ষকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পালন করেন হান্নান শাহ। ১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপদগামীর হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রাঙ্গুনিয়া থেকে প্রেসিডেন্টের মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসেন হান্নান শাহ।

এইচ এম এরশাদ সরকার হান্নান শাহকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়।স্বৈরাচার এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে আ স ম হান্নান শাহ কয়েকবার কারাগারে যান। তিনি সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এপিডি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) এর  চেয়ারম্যানও ছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সালে বিএডিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনে শুরুতে ১৯৮৩ সালে হান্নান শাহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, ১৯৮৬-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) এবং ১৯৯৩-২০০৯ সাল পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন।

বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের অধিকারী আ স ম হান্নান শাহ  গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে গাজীপুর- ৪(কাপাসিয়া) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং খালেদা জিয়ার সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

১/১১ এর কঠিন সময়ে খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে আ স ম হান্নান শাহ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দলের সংস্কারপন্থী অংশের কর্মকাণ্ড ও ষড়যন্ত্র এর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের সামনে এসে সাহসী কণ্ঠে কথা বলে দেশ-বিদেশে দলের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি কাড়েন তিনি। তখন খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগ ও শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে না দেয়ার ভূমিকার ব্যাপক সমালোচনা করেন। গণমাধ্যমে তখন সরকারের সমালোচনার কারনে বার বার হান্নান শাহ’কে জেলে যেতে হয়েছে।

দলের এ ক্রান্তিকালে সক্রিয় ভূমিকার কারনে ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে আ স ম হান্নান শাহ দলীয় সবোর্চ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ষষ্ঠ কাউন্সিলেও তিনি এই পদে পুনর্নির্বাচিত হন। হান্নান শাহ ছিলেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তার ক্ষুরধার যুক্তি বক্তব্যের কারণে দর্শকদের কাছে তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয়।

হান্নান শাহ্ কৃতি ফুটবলার, হকি ও গল্ফ খেলোয়ার ছিলেন । তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকার ওয়ান্ডার্স কাবের গোল রক্ষক ছিলেন। তিনি বক্সিংয়ে সেনাবাহিনীতে রেকর্ড তৈরী করেছিলেন। বাংলাদেশ সুটিং ফেডারেশনের সভাপতিও ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে পৃথিবীর ৫০ টির মত দেশ ভ্রমন করেছেন।রাজনৈতিক কারণে তার বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী নাহিদ হান্নান, ২ পুত্র শাহ্ রেজাউল হান্নান, শাহ্ রিয়াজুল হান্নান ও মেয়ে শারমিনকে রেখে গেছেন। হান্নান শাহ্’র বড় ছেলে শাহ্ রেজাউল হান্নান গাজীপুর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি। ছোট ছেলে শাহ্ রিয়াজুল হান্নান জেলা জাসাসের নেতা। হান্নান শাহ্’র অবর্তমানে ছোট ছেলেই এলাকার রাজনীতি দেখবাল করছিলেন।বাংলাদেশের প্রথম এটর্নী জেনারেল ফকির সাহাব উদ্দিন ছিলেন হান্নান শাহ্’র চাচাত ভাই।

তার র্দীঘ রাজনৈতিক জীবনে এলাকার স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার উন্নয়নে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে স্থানীয় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর তার নির্মিত ‘ফকির মজনু শাহ সেতু’ স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: কাপাসিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও তারাগঞ্জ কলেজে রাষ্টবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনায় নিয়োজিত।