কিংবদন্তি হুমায়ুন ফরিদী

0
938

কিংবদন্তি হুমায়ুন ফরিদী

মুঘল সম্রাট হুমায়ুন সম্পর্কে খুব বেশি না জানলেও শিল্প-সাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম পুরুষদের আমরা ভাল করেই চিনি জানি। হুমায়ূন নামের প্রায় সবাইতো দেখি কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন কবির, হুমায়ুন ফরিদী। আজ শুধু জীবনের নাট্যমঞ্চ থেকে আচানক ঝরেপড়া ঐ ফরিদীর কথাই বলব। অন্যদের কথা অন্যদিন।

কিংবদন্তি হুমায়ুন ফরিদী

২০১২ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারি শতকোটি ভক্তকে বেদনার সাগরে ডুবিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন হুমায়ূন ফরিদী। প্রিয় অভিনেতাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। জীবনভর শুধু অভিনয়ই করে গেছেন। নিজেই বলতেন ‘অভিনয় ছাড়া আর কিছুই পারি না আমি’। ভীষণ কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন। নাটকের সেটে নাকি সদা সবাইকে কৌতুকে মাতিয়ে রাখতেন।

এত কৌতুক মনে রাখেন কীভাবে, প্রশ্নের উত্তরে একবার বলেছিলেন, জীবনটাই তো কৌতুক, আমরা কেউ থাকব না, থাকবে শুধু কৌতুক। নিজের জীবনের সাথে কৌতুক করতে করতে অস্তাচলে যাওয়া হুমায়ূন ফরিদীর অভাব কখনোই পূরণ হবার না।

জানা যায়, অভিনয় জীবনের মতই ইত্যাকার জীবনাচারেও ফরিদী ছিলেন সাবলীল-স্বতঃস্ফূর্ত।

শিল্পী হুমায়ুন ফরিদীর জন্ম ২৯ মে, ১৯৫২, নারিন্দা, ঢাকা। বাবা এ.টি এম নুরুল ইসলাম ছিলেন জুরী বোর্ডের কর্মকর্তা। বাবার বদলির চাকরীর সুবাদে ফরিদীকে মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ অসংখ্য জেলায় ঘুরতে হয়েছে।

মা বেগম ফরিদা ইসলাম গৃহিনী। ছোটবেলায় ছন্নছাড়া স্বভাবের জন্য ফরিদীকে ‘পাগলা’ ‘সম্রাট’,‘গৌতম’-এমন নানা নামে ডাকা হত।

প্রাথমিক শিক্ষা নিজ গ্রাম কালীগঞ্জে। মাদারীপুর ইউনাইটেড ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল পাস দিয়ে চাঁদপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হলেন। এলো একাত্তুর, চলে গেলেন যুদ্ধে। নয় মাসের যুদ্ধ পরে লাল-সবুজের পতাকা হাতে ঢাকায় ফিরলেও ঢাকা ভার্সিটিতে ফেরেন নি। টানা পাঁচ বছর বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়ে শেষে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অনার্সে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আল দীনের সংস্পর্শে আসেন। এই ক্যাম্পাসেই ‘আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নামে একটি নাটক লিখে নির্দেশনা দেন এবং অভিনয়ও করেন ফরিদী।

ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হন। জড়িয়ে যান মঞ্চের সাথে। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাঙালির নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক গঠনে গ্রাম থিয়েটারের ভূমিকা ছিল অসামান্য, ফরিদী এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মঞ্চ নাটককে প্রসারিত করতে তিনি নাটক কেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলেন। ‘গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশন’ এর অন্যতম।

১৯৯০ এর দশকে তিনি সিনেমার রূপালি জগতে পা বাড়ান।

সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করে ফরিদী মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক’-এ অভিনয় করেন। মঞ্চে তার সু-অভিনীত নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শকুন্তলা’, ‘ফনিমনসা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’ প্রভৃতি। ১৯৯০ সালে স্ব-নির্দেশিত ‘ভূত’ দিয়ে শেষ হয় ফরিদীর ঢাকা থিয়েটারের জীবন।

আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’ ফরিদীর অভিনীত প্রথম টিভি নাটক। আশির দশকের দর্শকদের নিশ্চয়ই বিটিভি’র ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩) তে সেরাজ তালুকদারের কথা মনে আছে। সেলিম আল দীনের রচনা ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় এই নাটকে ফরিদীকে দেখা যায় টুপি দাড়িওয়ালা শয়তানের এক জীবন্ত মূর্তি রূপে। “আরে আমি তো জমি কিনি না, পানি কিনি, পানি”, “দুধ দিয়া খাইবা না পানি দিয়া খাইবা বাজান”-এই ডায়লগ তখন তুমুল জনপ্রিয়।

এরপর শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ (১৯৮৭-৮৮)-এ ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রে-ফরিদীর অনবদ্য অভিনয় কেউ ভোলে নি। ভুলা কি যায়! অসম্ভব! ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২), ‘বকুলপুর কতদূর’ (১৯৮৫)’, ‘মহুয়ার মন’ (১৯৮৬), ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’ (১৯৮৬) ‘একদিন হঠাৎ’ (১৯৮৬), ‘ও যাত্রা’ (১৯৮৬) ‘পাথর সময়’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’ (১৯৯৩), ‘চন্দ্রগ্রন্থ’ (২০০৬), ‘কাছের মানুষ’ (২০০৬), ‘ে কোথাও কেউ নাই’ (১৯৯০), ‘মোহনা’ (২০০৬), ‘ভবেরহাট’ (২০০৭), ‘জহুরা’,‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘শৃঙ্খল’ (২০১০), ‘প্রিয়জন নিবাস’ (২০১১), ‘অক্টোপাস’, ‘আরমান ভাই দি জেন্টেলম্যান’ (২০১১)

-আরো আরো অনেক নাটকে বিরামহীনভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। উত্তেজনার উত্তুঙ্গে নিয়ে দর্শক-শ্রোতাকে দিবা-নিশি মাতিয়ে রেখেছেন। অসম্ভব ইম্প্রোভাইজ করতে পারতেন। কখনোই স্ক্রিপ্টের গণ্ডিতে আটকা থাকে নি। টেলিভিশন নাটকের সব আঙ্গিক ভেঙ্গে গড়ে তোলেন নতুন ধারা।

নব্বুইয়ের গোড়া থেকেই হুমায়ুন ফরিদীর বড় পর্দার লাইফ শুরু হয়। বাণিজ্যিক আর বিকল্প ধারা মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে প্রথম ছবি তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’। এরপর তার অভিনীত সিনেমার মধ্যে ‘সন্ত্রাস’, ‘বীরপুরুষ’, ‘দিনমজুর’, ‘লড়াকু’, ‘দহন,’ ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘কন্যাদান’ (১৯৯৫), ‘আঞ্জুমান’ (১৯৯৫), ‘দুর্জয়’ (১৯৯৬), ‘বিচার হবে’ (১৯৯৬),‘মায়ের অধিকার’ (১৯৯৬) ‘আনন্দ অশ্র“’ (১৯৯৭), ‘শুধু তুমি’ (১৯৯৭), ‘পালাবি কোথায়’, ‘একাত্তুরের যীশু’, ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘মিথ্যার মৃত্যু’. ‘বিদ্রোহ চারিদিকে, ‘ব্যাচেলর’ (২০০৪), ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), ‘রূপকথার গল্প’ (২০০৬), ‘আহা!’ (২০০৭), ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯), ‘মেহেরজান’ (২০১১) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

নেগেটিভ, পজেটিভ অর্থাৎ নায়ক-খলনায়ক দু চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল, এক কথায় ভার্সেটাইল। এক সময়ে মানুষ আর নায়ককে না, এক ভিলেনকে দেখতেই হলে যেতেন। সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী খলনায়ক ফরিদী। প্রায় দেড় দশক তিনি দর্শকদের চুম্বকের মত সিনেমা হলে আটকে রাখেন। ২০০৩ সালের পর সিনেমা প্রায় ছেড়ে দিলে দর্শকও হলবিমূখ হতে শুরু করে। তার অভিনীত শেষ সিনেমা ‘এক কাপ চা’ ২০১৪ সালে মুক্তি পায়। নাটকে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি মেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননা। আর ২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ ছবিতে সেরা অভিনেতা হিসাবে পান ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে কিছুদিন অতিথি শিক্ষক হিসাবেও পাঠদান করেন।

আমরা যারা নব্বুই দশকের সিনেমা দর্শক, তাঁরা যেন ফরিদীর একটু বেশিই ভক্ত। রেডিওতে তখন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কণ্ঠে সদ্য মুক্তি পাওয়া সিনেমার কথা শুনতাম। মাঝে মাঝে হুমায়ূন ফরিদীর ডায়লগ শুনানো হত। রেডিওতে ফরিদীর নাম শুনলেই কান উৎকর্ণ হয়ে উঠত। নিকটবর্তী হলে সেই সিনেমা আসলেই হামলে পরতাম। মনে পড়ছে একটি সিনেমায় অসংখ্যবার ফরিদীর সংলাপ ছিল, “আরে মাফ দে রে মাফ দে, লাশের মাফ দে”।

ভিলেন হিসেবে কোন শত্র“র চেহারা মনে পড়লেই চোখ দুটো কাচের গুলির মত ঘুরাতেন আর খ্যস খ্যস করে হাসতে হাসতে বলতেন, আরে মাফ দে রে…। অসংখ্য সিনেমার ডায়লগ মনে পড়ছে, কিন্তু তা লেখার মত যথেষ্ট পরিসর কোথায়।

বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’ প্রায়ই এমন একটা ফিলোসফিক্যাল কথা বলতেন ফরিদী। সহ-অভিনেতাদের কাছে তার দরাজ দিলের কথা শুনা যায়। নাট্যাঙ্গনে নাকি একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, যদি টাকা লাগে তবে হুমায়ূন ফরিদীর কাছ থেকে ধার নাও। কারণ ফেরত দিতে হবে না। কাউকে টাকা দিলে তা নাকি বেমালুম ভুলে যেতেন। তাই কোনদিন ফেরতও চাইতেন না।

একবার সেটে নাকি চঞ্চল চৌধুরীকে দুপুরের খাবারে ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দেখেছিলেন। চঞ্চলের ভর্তা পছন্দের কথা শুনে একদিন বাসায় নানা রকমের ভর্তা বানিয়ে তাঁকে আসতে বলেন। চঞ্চল তখন পাবনাতে। রাত দুইটায় তিনি ঢাকা ফিরলে ঐ রাতেই নাকি ফরিদীর বাসায় যেতে হয় দাওয়াত রক্ষা করতে। গিয়ে দেখেন প্রায় ৫০ রকমের ভর্তা সামনে করে বসে আছেন ফরিদী। আরেকবার নাকি হুতাপাড়া থেকে সূবর্ণার জরুরী ফোন পেয়ে রাত ২ টার পর ঢাকায় রওনা হন। হঠাৎ মনে পড়ে প্রোডাকশন বয় ইসমাইলকে কোন টিপস দেয়া হয় নাই। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বহুদূর এসে নিজে গাড়ি চালিয়ে আবার সেটে ফিরে গিয়ে ঐ রাতেই তাকে কিছু দিয়ে ঢাকায় ফেরেন। এমন বহু গল্প আছে যা তার হৃদয়ের বিশালতা প্রমাণ করে।

স্বাধীনতার পর সহপাঠীর বোন নাজমুন আরা বেগম মিনুর গলায় বেলী ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করেছিলেন। মিনু তাঁকে বোহেমিয়ান জীবন থেকে সংসারের সাজানো শয্যা পেতে দিয়েছিলেন। ধরে রাখতে পারেন নি। টেকেনি।

প্রথম প্রেমের সেই মালা ছিঁড়ে সূবর্ণা মুস্তাফার গলায় পড়িয়েছিলেন। না ফেরার দেশে পাড়ি জমানোর বছর চারেক আগে সে বন্ধনও ভেঙে যায়। টিকে থাকে শুধু সারারাত ইসলাম দেবযানী, ফরিদী-মিনুর ভালবাসার বেলী ফুল, একমাত্র কন্যা।

৬০ তম জন্মদিনে শেক্সপীয়রের ‘কিং লিয়ার’-এ অভিনয়ের বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন। হলো না। ৬০ পূর্ণ হবার আগেই বহু অজানা অপূর্ণ বাসনা নিয়ে চলে গেলেন এই জাত অভিনেতা। দেশের সিনেমা-নাটক নির্মাণ জগতের বোদ্ধারা কেউ কেউ দাবি করেন যে, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার আর নির্মাণের ক্যারিশমা দিয়ে যদি ফরিদীকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যেত তবে উপমহাদেশের শীর্ষ সারির একজন অভিনেতা হিসাবে তাঁর স্বীকৃতি মিলত।

একান্ত ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব অভিমানী এই শিল্পী জীবনকে পিষে-ঘষে-পুড়িয়ে জীবন ধরার চেষ্টা করে গেছেন। এখনো চোখ মুদলে তাঁর অট্টহাসিতে কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনি। বিস্ময় জাগানিয়া অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী এখনো আমাদের ঘোরের মধ্যে নিয়ে যান। এমন ক্ষমতা ক’জনের আছে, ক’জনের থাকে।

দিন যায়, মাস যায়, পেরোয় বছর। মিডিয়া জগত থেকে টেলিভিশন, সিনেমার পর্দা থেকে মঞ্চের রহস্যঘেরা দুনিয়া-সবখানেই তাঁর অনুপস্থিতি যেন দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। জাহাঙ্গীরনগরের মুক্ত মঞ্চ, বেইলী রোডের নাটকপাড়া, এফ ডি সি’র রঙমহল-সব খা খা করে। সর্বত্রই বেদনার নীল পাখিদের ডানা ঝাপটানি শুনি। ফরিদী নাই। নাই হুমায়ুন ফরিদী। তিনি ঠাঁই নিয়েছেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে, মগজে। ফরিদী আছেন পৃথিবীর সব নাট্যমঞ্চের ড্রেসিং রুমে, পাটাতনে আছেন রূপোলি পর্দার আড়ালে, থাকবেন অনন্তকাল।