কালীগঞ্জ উপজেলা

কালীগঞ্জ উপজেলার পরিচিতি

ভূমিকাঃ স্বচ্ছ সলিলা শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকায় ভাওয়াল পরগনার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ঘেঁষে অবস্থিত একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ কালীগঞ্জ। দক্ষিণে পলিসমৃদ্ধ সমতল ভূমি, উত্তরে ভাওয়াল গড়ের অসমতল ভূ-স্তর, সর্বত্র অসংখ্য ছোট বড় খাল-বিল ও গাছ-গাছালি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে করেছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রমন্ডিত।

নামকরণঃ ইতিহাস থেকে জানা যায়, নদী সংলগ্ন বাণিজ্য কেন্দ্র সাধারণত ‘‘গঞ্জ’’ নামে পরিচিত ছিল। আর শক্তি সাধনার পীঠস্থান বঙ্গভূমি অবহমান কাল ধরেই শক্তিদেবী কালীর নামের সাথে যুক্ত করেছে অসংখ্য জনপদকে। স্থানের নামকরণের এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে কালীগঞ্জের নামকরণের যথার্থতা প্রতিপন্ন হয়। কেননা কালীগঞ্জ সদরে শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী ঐতিহাসিক হাট ও কালীমন্দির আজও সেই তথ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। অবশ্য এ সম্পর্কে ভিন্নমতও প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করে কালীগঞ্জের নামকরণ হয়েছে ভাওয়াল পরগণার প্রতাপশালী সামন্ত রাজা কালীনারায়ণ রায়ের নামানুসারে।

অবস্থান ও আয়তনঃ রাজধানী শহর সংলগ্ন টঙ্গী শিল্প অঞ্চণের পূর্বে ২০ কিঃমিঃ দূরে ঐতিহ্যবাহী মসলিন কটন মিল ও তাঁত সমৃদ্ধ ছায়া-ঢাকা, পাখী-ঢাকা জনপদ কালীগঞ্জ উপজেলা। কালীগঞ্জ উপজেলার অবস্থান ২৩ ৫২৩র্ হতে ২৪ ২র্ উত্তর অক্ষাংশ এবকং ৯০ ২৮র্ হতে ৯০ ৩৯র্ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। গাজীপুর জেলার জেলার মোট ভূমির শতকরা ১০.৫৩ ভাগ নিয়ে সর্ব ক্ষুদ্র উপজেলা কালীগঞ্জ। ২১৭.৩৪ বর্গ কিঃমিঃ আয়তন বিশিষ্ট ও উপজেলার উত্তরে কাপডাসিয়া, দক্ষিণে রূপগঞ্জ ও পলাশ, পূর্বে পলাশ, পশ্চিমে রূপগঞ্জ, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর উপজেলা। পূর্ব-দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী আর পশ্চিমে বালু নদীর অবস্থান আুপজেলার মনোরম আবহাওয়া ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।

প্রশাসনিক ইতিহাসঃ ১৯৪৭ সালে ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় কালীগঞ্জ থানা। ১২ টি ইউনিয়ন হল কালীগঞ্জ সদর, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মোক্তারপুর, বাড়িয়া, জামালপুর, বাহাদুরসাদী, ঘোড়াশাল, জিনারদী, চরসিন্দুর, গজারিয়া এবং ডাঙ্গা। এর মধ্যে ঘোড়াশাল, জিনারদী, চরসিন্দুর, গজারিয়া এবং ডাঙ্গা ইউনিয়ন পলাশ পুলিশ ফাঁড়ির অধীনে ছিল।

১৯৮২ সালে কালীগঞ্জ সদর জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মোক্তারপুর, বাড়িয়া, জামালপুর, বাহাদুরসাদী এই ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় কালীগঞ্জ উপজেলা। বাকী ৫টি ইউনিয়ন নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় অন্তর্বূক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে বাড়িয়া ইউনিয়নটি গাজীপুর সদর উপজেলা এবং রূপগঞ্জের তুমুলিয়া ও নাগরী ইউনিয়ন দুটি কালীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভক্ত ২য়। অর্থাৎ বর্তমানে কালীগঞ্জচ সদর, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মোক্তারপুর, জামালপুর, বাহাদুরসাদী, তুমুলিয়া ও নাগরী এই ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা গঠিত।

জনবসতির ইতিবৃত্তঃ প্রাচীন বঙ্গ জনপদের অন্তর্বূক্ত জনবসতি এই অঞ্চলে সুপ্রাচীন কাল থেকেই ছিল তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বিজিত ও বিতাড়িত লক্ষণ সেন ও তার বংশধররা দীর্ঘ দিন পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছিল। এ সময় অত্র অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরে বাংলায় মুসলিম রাজত্বকালে গাজীপুর অনেকগুলো চেদি রাজ্যে বিভক্ত হয়। কালীগঞ্জ ছিল স্বাধীন সামন্ত রাজ্যের রাজা খাইডা ডোসকার অধীনে। এই চেদি রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মামলম্বী কিছু লোক পাওয়া যায় যারা চন্ডাল উপজাতি নামে পরিচিত। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মিঃ ওয়াইজ নগরী ও পার্শ্ববর্ত্বী এলাকায় একটি পরিসংখ্যান চালিয়ে পাঁচ হাজার চন্ডালের সন্ধান পেয়েছিলেন। শেষ সামন্ত শাসন রানী ভবানীকে পরাজিত করে পালোয়ান গাজী সমগ্র গাজীপুরে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তারই পুত্র কারফরমা শাহ গাজী অত্র এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন এবং ইসলাম ধর্ম দ্রুত প্রসারিত হতে শুরু করে। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী এলাকায় খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারে সুৃচনা হয়। বর্তমানে দেশের উলে­খযোগ্য সংখ্যক খ্রীষ্টান কালীগঞ্জ এলাকায় বাস করে। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্ঠান জনগোষ্টীর বাইরেও এই উপজেলায় কিছু আদিবাসী যেমন নিষাদ, ডোম, সাওতাল, কোচ, রাজবংশী, মান্দী সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ মিলত যাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এছাড়াও পূবাইল ব্রিজের নিচে নৌকায় বসকাসকারী একশ্রেণীর বেদে সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব লক্ষণীয়, যারা মুসলমান সম্প্রদায়ভূক্ত অথচ জাতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে আদিবাসী

নদ-নদী, খাল বিল

শীতলক্ষ্যা নদীঃ  রুপার মত স্বচ্ছ জলরাশিকে যে নদী ধারণ করে আছে তাই শীতলক্ষ্যা। উৎসমুখ ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ তীরস্থ টোক নয়ন বাজারের নিকট খারসাদী (গার নদী) নামক স্থানে, এরপর একডালা হয়ে কালীগঞ্জ সীমানায় পড়েছে। কালীগঞ্জের পূর্ব ও দক্ষিন সীমান্তে নির্দেশ করে মোক্তারপুৃর, জামালপুর, বাহাদুরসাদী, কালীগঞ্জ, তুমুলিয়া ও নাগরী ইউনিয়নের পার্শ্ব দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। এ সময় এর প্রবাহ মধ্যগতির রুপ পরিগ্রহ করেছে। সুতী, বালু, চিলাই ইত্যাদি শীতলক্ষার উপনদী। পূর্বে এই নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে পলাশ উপজেলায় প্রচুর শিল্প গড়ে ওঠায় শিল্পবর্জের কারণে মাছ কম পাওয়া যায়।

বালু নদী টঙ্গী খালের পর অর্থাৎ কহরদরিয়ার পূর্বাংশে রেলসেতুর নিকট হতে পূবাইল উলুখোলা হয়ে ডেমরার নিকট শীলক্ষায় পতিত স্রোত ধারার নামই বালু নদী। ইহা মূলতঃ টঙ্গী খালের বর্ধিতাংশ যা তুরাগ ও শীতলক্ষা নদীর মধ্যে একটি সংযোগ নদী হিসাবে কাজ করছে। বালু নদী আরও দক্ষিণে কালীগঞ্জ রেল স্টেশনের পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত ক্ষুদ্র খাল দ্বারা কালীগঞ্জের নিকট লক্ষ্যার সাথে যুক্ত।

পারুলীঃ জেলার অন্য একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর নাম পারুলী। এই পারুলী নদীর তীরেই এক কালের ভাওয়ালের চেদী রাজ্যের রাজধানী চিনাশুখানিয়া অবস্থিত। বর্তমানে নদীটির পূর্বতীরে গাজীপুর জেলার বিখ্যাত রাজবাড়ী বাজার অবস্থিত। নদীটি বর্মী বাজারের নিকট শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরের অবনতি অংশ মাটিয়াগারা গ্রাম হতে বের হয়ে দক্ষিণ দিয়ে শেরা খাল নামে প্রবাহিত হয়ে বাউনী গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে পারুলী নাম ধারণ করেছে। পরে ইজ্জতপুরের নিকট বনের মধ্যে দিয়ে সর্পিল আকারে রাজাবাড়ী হয়ে আরো দক্ষিণে কালীগঞ্জের নরুণ গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে বিল বেলাই এ পতিত হয়েছে।

নাগদা গাং নাগদা বালু নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে বক্তারপুর ও জাঙ্গালীয়া ইউনিয়ন এর সীমা নির্দেশ করে পূর্বদিকে মোক্তারপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বাহাদুরসাদী হয়ে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে। এই নদীতে এখনো প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এখানে দেশের প্রথম জালের খাচাঁয় মাছ চায় আরম্ভ হয়।

দুলন খাল (আঞ্চলিক দোলন) কামতা গ্যাস ফিল্ডের নিকট বালু নদীতে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ পূর্ব দিকে নাগরী ইউনিয়ন অতিক্রম করে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে।

ভাদার্তি খাল (আঞ্চলিক নাম তুমুলিয়া খাল বা জয়রামবেড় খাল)  চিলাই নদী হতে উৎপত্তি হয়ে তুমুলিয়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে ভাদার্তী গ্রামের দক্ষিণে শীতলক্ষ্যায় পতিত।

কালিয়াখালী খালঃ  বেলাই বিল হতে উৎপন্ন নদীটি ক্রমশ দক্ষিণ মুখী হয়ে বক্তারপুর ইউনিয়ন হয়ে সাওরাইদ বাজারের পূর্ব দিক থেকে শুরু করে ধনপুর কালিহাতি, রাথুরা, নোয়াপাড়া, ডেমরা দিয়ে কালিয়াখালী খালটি শীতলক্ষ্যায় পতিত।

বিল বেলাইঃ শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণে সদর উপজেলার বাড়িয়া ও পূবাইল ইউনিয়নের পূর্বে এবং কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালীয়া, বক্তারপুর ও তুমুলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমে ৩০ বর্গ কিঃ মিঃ ব্যপি বেলাই বিল। রাজাকালী নারায়ণ ও রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণের সময় ম্যানেজার স্টুয়ার্ড কৃষিতে সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার  জন্য বিল বেলাই এর খাল পুনঃ খনন ও সংস্কার করেন। তার নামে এখনো খালের নাম স্টুয়ার্ডের খাল। বিল বেলাই, লবলং আদি ব্রক্ষ্মপুত্রের পরিত্যক্ত খাত যা ভূ- আন্দোলনের দরুণ একটি অবনমন হিসাবে টিকে আছে। বিলে নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ পাওয়া যায়। তবে ভরাট হওয়ার দরুণ শুকনো মৌসুমে বিলটি বোরো ও আমন শস্য ক্ষেত্রে পরিণত হয়

এ ছাড়াও  বিরলা, কাটাখালী খাল, লতিয়ার ভাঙ্গা খাল কালীগঞ্জের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলার ভৌগলিক পরিচিতি

অবস্থান ও আয়তনঃ

রাজধানী শহর সংলগ্ন টংগী শিল্প অঞ্চলের পূর্বে ২০ কিঃমিঃ দূরে ঐতিহ্যবাহী মসলিন কটন মিল ও তাঁত সমৃদ্ধ ছায়া-ঢাকা জনপদ কালীগঞ্জ উপজেলা। কালীগঞ্জ উপজেলার অবস্থান ২৩°৫২৩’হতে ২৪°২’উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°২৮’হতে ৯০°৩৯’পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। গাজীপুর জেলার মোট ভূমির শতকরা ১০.৫৩ ভাগ নিয়ে সর্ব ক্ষুদ্র উপজেলা কালীগঞ্জ। ২১৭.৩৪ বর্গ কিঃমিঃ আয়তন বিশিষ্ট এ উপজেলার উত্তরে কাপাসিয়া,দক্ষিণে রুপগঞ্জ ও পলাশ,পূর্বে পলাশ,পশ্চিমে রুপগঞ্জ, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর উপজেলা। পূর্ব-দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী আর পশ্চিমে বালু নদীর অবস্থান উপজেলার মনোরম আবহাওয়া ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।

ইউনিয়ন সমূহ

১। বক্তারপুর

২। মোক্তারপুর

৩। জামালপুর

৪। জাঙ্গালিয়া

৫। বাহাদুরসাদী

৬। নাগরী

৭। তুমলিয়া

ভাষা ও সাহিত্য

ভাষা ও সাহিত্য

রত্নাগর্ভা কালীগঞ্জ, যার বুকে জম্ম নিয়েছে অনেক ইতিহাস। ভাষা ও সাহিত্য চর্চাতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ও করছে কালীগঞ্জ উপজেলা।

বাংলা ভাষার প্রথম অভিধানঃ কালীগঞ্জের গর্ব আঠার শতকের প্রথম তিনের দশকে পর্তুগীজ পাদ্রী ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাঁউ নাগরী গীর্জায় বসে রচনা করেন বাংলা ভাষায় এক দ্বিভাষিক অভিধান ও খন্ডিত ব্যাকরণ ‘‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগেল্লা ই পর্তুগীজ ( Vocabulario Em Edioma Bengalla E Portuguese)” বা বাংলা পর্তুগীজ শব্দকোষ ও বাগধারা। অভিধানটিতে বহুলাংশে প্রধানত ভাওয়াল অঞ্চলের প্রাত্যহিক শব্দ স্থান পেয়েছে। সমগ্র ভারত বর্ষে এটাই ছিল প্রথম প্রকাশিত (১৭৪৩ সালে লিসবনে রোমান বর্ণমালায় মুদ্রিত) বাংলা ভাষায় অভিধান যা নিজেই প্রকাশ করেন।

বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য গ্রন্থ্যঃ বাংলা সাহিত্যের সুতিকাগার হল কালীগঞ্জ। ফরিদপুরের ভূষনার হিন্দু রাজকুমার (নাম জানা যায়নি) অপহরণের পর পরবর্তীতে খ্রীষ্টান হয়ে নামকরণ হয় দোম আমত্মনি দো রোজারিও। তিনি ১৭৩৩ সালে নাগরী গীর্জায় বসে বাংলা ভাষায় প্রথম গদ্য গ্রন্থ্যঃ ‘‘ ব্রাম্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’’ রচনা করেন। জনৈক খ্রীষ্টান অথবা রোমান ক্যাথলিক এবং জনৈক ব্রাম্মণ বা হিন্দুদের আচার্যের মধ্যে শাস্ত্র সম্পর্কীয় তর্ক ও বিচার এই গ্রন্থের বক্তব্য। কালীগঞ্জের বাংলা বলার অতীত ঢংয়ে রচিত হয়েছে এই বই। ১৭৩৩ সালে রচিত হলেও লিসবনে রোমান বর্ণমালায় ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাঁউ কর্তৃক প্রকাশিত হয় ১৭৪৩ সালে।

বাংলা ভাষার দ্বিতীয় গদ্য গ্রন্থ্যঃ বাংলা ভাষার প্রথম অভিধানের রচয়িতা পর্তুগীজ পাদ্রী ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাঁউ ১৭৩৪ সালে নাগরী গীর্জায় বসে রচনা করেন বাংলা ভাষার দ্বিতীয় গদ্য গ্রন্থ্যঃ ‘‘কৃপা শাস্ত্রের অর্থভেদ’’। পুসিত্মকাটি যীশু খৃস্ট ও তাঁর শিষ্যদের মধ্যে কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে রচিত। এটিও তিনি ১৭৪৩ সালে লিসবন থেকে রোমান বর্ণমালায় ছাপার হরফে প্রকাশ করেন।

দোম আমত্মামিত্মর পালাগানঃ বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য গ্রন্থ্যের রচয়িতা দোমআমেত্মানির দো রোজারিও লক্ষ্য করলেন স্থানীয় ভাবে ধর্ম প্রচারের জন্য দরকার গণমানুষের কথামালা। সেই কালে তা সম্ভব ছিল পালাগানের মাধ্যমে। ফলে তিনি সরল ভাবে রচনা করলেন পালাগান। ধীরে ধীরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়া কথ্য ভাষায় আঠার শতকের ত্রিশের দশকে বাইবেলের কিছু অংশের অনুবাদও করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হ্যানা ক্যাথরিন ম্যানহাল কর্তৃক রচিত ‘‘ করুনা ও ফুলমনির বিবরণ’’ গ্রন্থ্যটি ও ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

আধুনিক কালে কালীগঞ্জের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে আবু জাফর সামসুদ্দিন, আব্দুল আজিজ বাগমার, হুমায়ুন খান, বুলবুল চৌধুরী এবং ভাষা সৈনিক আলাউদ্দীন  হোসেন অন্যতম।

ভাষা ও সাহিত্য জগতের বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্বঃ রত্নাগর্ভা কালীগঞ্জ যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে ভাষা ও সাহিত্য জগতের উল্লেখ যোগ্য ব্যাক্তিত্বের, যেমনঃ

ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাঁউঃ বাংলা সাহিত্য, ভাষা এমনকি ভারতবর্ষের সাহিত্য শিক্ষাঙ্গনে পর্তুগীজ পাদ্রী ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাঁউ এর নাম অত্যমত্ম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে। তিনি আঠার শতকে সুদুর পর্তুগাল থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য কালীগঞ্জের নাগরী এসেছিলেন। নাগরীতে বসে ধর্ম প্রচারের সাথে সাথে কালীগঞ্জের কথ্য ভাষায় প্রথম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দ্বিভাষিক অভিধান ও খন্ডিত ব্যাকরণ এবং দ্বিতীয় গদ্য গ্রন্থ্য কৃপা শাস্ত্রের অর্থভেদ রচনা করেন। তৎকালে কোন প্রেস না থাকায় তিনি ১৭৪৩ সালে তার ও দোম আমত্মনি দো রোজারিও এর জন্য পর্তুগালের লিসবন থেকে মুদ্রণ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেন।

দোম আমেত্মানি দো রোজারিও ১৬৬৩ খ্রীস্টাব্দে মগ জলদস্যুরা ভূষণার রাজবাড়ী লুন্ঠনের সময় শিশু রাজকুমারকে অপহরণক করে আরাকানে নিয়ে যান। তৎকালে আরাকানে বসবাসকারী পর্তুগীজ পাদ্রী ম্যানুয়েল দো রোজারিও টাকার বিনিময়ে রাজকুমারকে ক্রয় করেন। খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করে নাম দেন দোম আমেত্মানি রোজারিও। তিনি কালীগঞ্জের বাংলা কথ্য ভাষায় লিখিত প্রথম গদ্য গ্রন্থ‘‘ ব্রাম্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’’ ১৭৩৩ সালে নাগরী গীর্জায় বসে রচনা করেন।

আবু জাফর সামসুদ্দিনঃ আবু জাফর মোহাম্মদ সামসুদ্দিন ওরফে আবু জাফর সামসুদ্দিন ১৯১১ সালের ১২ই মার্চ কালীগঞ্জের দক্ষিণবাগ গ্রামে জম্মগ্রহন করেন। পিতার নাম মোহাম্মদ আববাস আলী ভূঁইয়া ও মাতার নাম মোছাঃ আফিফা খাতুন, দাদা ছিলেন বিখ্যাত মাওলানা কেরামত আলীর খলিফা বা স্থানীয় প্রতিনিধি। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি গ্রহণ তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সরকারী চাকুরী দিয়ে জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে সাহিত্য ও সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করে ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে পরিত্যক্ত সাক্ষী (১৯৪৭), ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান(১৯৬৩), পদ্মা-মেঘনা-যমুনা(১৯৭৪), মুক্ত(১৯৪৮), শংকর সংকীর্তন (১৯৮০), প্রপঞ্চ (১৯৮০), দেয়াল (১৯৮৬), আত্নজীবনী আত্নস্মৃতি (১৯৮৯), প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য ও সাংবাদিকতা সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ২১শে পদক, আলাওল  সাহিত্য পুরস্কারসহ বিবিধ পদক লাভ করেন। ১৯৮৮ সালের ২৪শে আগষ্ট এই মহান কৃতি পুরুষ ইহলোক ত্যাগ করেন।

আলাউদ্দীন হোসেনঃ বিশিষ্ট ভাষা সৈনিক আলাউদ্দীন হোসেনের জন্ম ১৯৩১ সালে কালীগঞ্জের ভাদার্ত্তী গ্রামে। রোটারিয়ান আলাউদ্দিন হোসেন গাজীপুর রোটারী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন। তার লেখা প্রবন্ধ বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত।

আব্দুল আজিজ বাগমারঃ জম্ম ২২শে মে ১৯৪৬ সনে কালীগঞ্জে। তিনি স্বাধীকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কিত বহু গ্রন্থের রচয়িতা, যেমন, বাঙ্গালী কি চান ?, শকুন শৃগালের আবার বাংলা আক্রমন, তিহার জেলে ত্রিশ দিন, বিপন্ন মানবতা, স্বাধীনতার স্বপ্ন উম্মেষ ও অর্জন, মুক্তিযুদ্ধ ও আতিয়া ইত্যাদির রচয়িতা।

পর্যটন কেন্দ্র/দর্শনীয় স্থান/রেস্ট হাউস

প্রভূত সম্ভাবনা থাকা সত্বেও কালীগঞ্জ পর্যটন শিল্প বিকাশ লাভ করতে পারেনি। কালীগঞ্জ উপজেলা বেষ্টনকারী প্রায় ৩৫ কিঃমিঃ দীর্ঘ শীতলক্ষা, বালু নদীর তীরবর্তী এলাকা, মোক্তারপুরের বনভূমি, ঐতিহাসিক নাগরী, পানজোড়া গীর্জাসহ অনেক স্থান রয়েছে যা যে কোন পর্যটক/আগন্তুককে মুগ্ধ করতে পারে।

১। নারগানা রেস্ট হাউজঃ জামালপুর ইউনিয়নের নারগানা গ্রামে শীতলক্ষ্যার পাড় ঘেঁষে বিদ্যু উন্নয়ন বোর্ড, পলাশ, নরসিংদীর মালিকানাধীন নারগানা রেস্ট হাউাজ একটি আন্যতম আকর্ষণীয় রেস্ট হাউজ যেখানে উপভোগ করা যায় শীতলক্ষ্যার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। মূলত বিদেশী প্রকৌশলীদের থাকার জন্যই এটি নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

২। ধনপুর বনভূমিঃ মোক্তারপুর ইউনিয়নের ধনপুর গ্রামে প্রায় ৩৫ হেক্টর জমির উপর গজারী বৃক্ষের বনভূমি রয়েছে। যথাযথ পরিচর্যা ও একটি রেস্ট হাউজ নির্মান করা হরে এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

৩। নাগরীঃ পর্তুগীজ স্থাপত্য নিদর্শনে তৈরী দর্শনীয় সেন্ট নিকোলাস টলেন্টিনো চার্চ ও সাধু  আন্তুনীর গীর্জা নাগরীকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিশেষভাবে যারা বাঙ্গালী খ্রষ্টানদের জীবন-যাপন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ধর্মীয় আচার আচরণসহ তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তাদের জন্য এটি হতে পারে এক আদর্শ স্থান। এখানে খাওয়ার জন্য বাজারে সাধারণ মানে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আবার পিকনিকে গেলে কাছাকাছি গ্রামের খালি জায়গায় রান্না করে খাওয়া যায়। বর্ষা মৌসুমে এখানে বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রলার যোগে অনেকে পিকনিক করতে আসেন।

৪। উত্তর রূপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের রেস্ট হাউসঃ তুমুলিয়া ইউনিয়নের বরতুল গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউজ অবস্থিত। এটি একটি অন্যতম আকর্ষণীর রেস্ট হাউস যেখানে উপভোগ করা যায় শীতলক্ষ্যার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

৫। হযরত নবী শাহ্ (রঃ) এর দরগাঃ নাগরী ইউনিয়নের উলুখোলা বাজারের সন্নিকটে বাইপাস সড়কের কাছে বিরতুল গ্রামে হযরত নবী শাহ্ (রঃ) এর দরগা অবস্থিত।  জানা যায় যে, প্রায় তিনশ বছর পূর্বে তিনি চারটি পাথর নিয়ে এসে আসেন। পাথরগুলো এখনও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে যায় একটিতে হাতের ছাপ, একটিতে পায়ের ছাপ রয়েছে, আরেকটি পাথরের ওজন প্রায় ৪০/৫০ কেজি, অন্য পাথরটি ছোট। কথিত রয়েছে মাজারের কাছাকাছি কোন নৌকার যাত্রী মাজারের প্রতি অবমাননাকর কোন আচরণ করতে নৌকা আটকে যেত অথবা ক্ষতিকর কোন ঘটনা ঘটত।

৬। নাগরী গীর্জাঃ আঠার শতকের প্রথম তৃতীয় দশকে পর্তুগীজ পাদ্রী ম্যানুয়েল  দা আসসুম্পসাউ নাগরী সেন্ট নিকোলাস গীর্জায় বসে রচনা করেন বাংলা ভাষার এক দ্বিভাষিক অভিধান ও খন্ডিত ব্যাকরণ। ধারনা করা হয় এটাই ছিল প্রথম প্রকাশিত বাংলা ভাষার অভিধান। বাংলাভাষার প্রথম গদ্য সাহিত্য ও রচিত হয় এই গীর্জায় বসে । আধুনিক কালে কালীগঞ্জের উল্লেখ যোগ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি আবু জাফর শামসুদ্দীন অন্যতম।

৭। বক্তারপুর ঈশা খাঁর মাজারঃ বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ইতিহাস খ্যাত মুসলিম জমিদার ঈসা খাঁন ছিলেন সোনার গাঁয়ের জমিদার। তিনি ভাওয়াল পরগনার জমিদার ফজল গাজী এবং তিলা গাজীর সাথে সখ্যতা বজায় রাখতেন। তাঁর অনেক যুদ্ধ জাহাজ/নৌকা/কোসা  কালীগঞ্জ এলাকায় রাখা হত বলে অনুমান করা হয়। মুঘলদের সাথে যুদ্ধের এক  পর্যায়ে ঈসা খান। ভাওয়াল পরগনার দিকে চলে আসেন এবং অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরন করেন। কালীগঞ্জের বক্তারপুরে একটি কবরকে প্রত্নঅধিদপ্তর ঈশা খাঁর কবর বলে ধারনা পোষন করছেন। এটি বক্তারপুর বাজার হতে পশ্চিমে অবস্থিত।

৮। শাহ কারফরমা  আউলিয়ার মাজার ও দীঘিঃ কালীগঞ্জের চৌড়া এলাকায় গাজীদের আমলে যারা ইসলাম ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন তন্মধ্যে শাহ কারফরমা আওলিয়া অন্যতম। তিনি আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীতে মৃত্যু বরন করেন। চৌড়ায় তাঁর মাজার রয়েছে। কথিত আছে এলাকার মানুষের পানীয়ের অভাব মিটানোর জন্য গাজীরা আনুমানিক ৩৫ বিঘা আয়তনের একটি দীঘি খনন করেন। যা বর্তমানে বিদ্যমান আছে। চৌড়ায় এ দরগা প্রাঙ্গণে একটি মসজিদ এবং দিঘী রয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ থেকে বাইপাস সড়ক পেরিয়ে উত্তর পাশে এর অবস্থান।

৯। শাহ পালোয়ান গাজীর মাজারঃ ইতিহাস খ্যাত ভাওয়াল পরগনার পত্ত্বনকারী গাজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা এই শাহপালোয়ান গাজী যিনি শাহ পালোয়ান খান নামে পরিচিত ছিলেন।তিনিই গাজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলে ধারনা করা হয়। চৌড়া শাহ কারফরমা আওলিয়া দরগা থেকে পূর্বে পাশে কাজী বাড়ির পাশে তাঁর মাজার রয়েছে।

১০। সরল শাহ আউলিয়ার মাজারঃ কালীগঞ্জের জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের নরুন গ্রামে রয়েছে সরল শাহ আওলিয়ার মাজার। চর্তুদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে সকল আওলিয়া ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য বঙ্গে এসেছিলেন তন্মধ্যে গোলাপ শাহ পীর এবং তার ভ্রাতা সরল শাহ অন্যতম। সরল শাহ ভাওয়াল পরগনার গভীর জঙ্গলে বসবাস রত মানুষদের ইসলামের দীক্ষা দিতেন। তিনি আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীতে গাজীপুর এলাকয় মৃত্যুবরন করেন।

১১। নাগরী সেন্ট নিকোলাস চার্চঃ আঠারশতকে পর্তুগীজরা গাজীপুর পরগনার নাগরী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। তারা খৃষ্ঠ-ধর্ম প্রচার শুরু করেন। নাগরি এলাকার পানজোড়া গ্রামে গড়ে তোলেন এ উপমহাদেশের প্রথম গীর্জা যা সেন্ট নিকোলাস গীর্জা নামে খ্যাত। এটি আনুমানিক চারশত বৎসরের পুরনো একটি গীর্জা। গীর্জাটির পাশে বর্তমানে সাধু টলেন্টিনুর নামে আর একটি বৃহৎ গীর্জা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ধারনা করা হয় উপমহাদেশের প্রথম বাংলা অভিধান এই প্রাচীন গীর্জায় বসে রচিত হয়েছিল।

১২। রাজা  রাজেন্দ্র নারায়ন পাইলট স্কুল, রাজ কাচারী, কালীমন্দির এবং মাঠঃ বৃটিশ আমলে কালীগঞ্জে জয়দেবপুরের জমিদার রাজা রাজেন্দ্র নারায়ন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এ স্কুলে প্রাচীন আমলের লাল ইটের একটি দ্বিতল বিশিষ্ট সুরম্য ইমারত রয়েছে।

১৩। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে খাদ্য গুদামের পাশে রয়েছে জমিদারী আমলের রাজ কাচারী যা আজও ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৪। খাদ্য গুদামের সামনে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে একটি জীর্ণ মঠ মন্দির আছে। এ ছাড়া কালীগঞ্জ বাজারে আছে প্রাচীন জমিদারী আমলের কালী মন্দির।

১৫। সাধু অ্যান্থনীর গীর্জাঃ এটি খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বীদের নিকট অত্যান্ত ধর্মীয় পবিত্র স্থান। প্রতি বছরের ০৩ ই ফেব্রুয়ারী সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় লক্ষাধিক খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বীদের মিলন মেলা হয়। অনেক বিদেশী প্রতিনিধিও উক্ত স্থানে আগমন করেন।

এছাড়া বক্তারপুরের ঈশা খাঁর মাজার, তুমুলিয়া গীর্জা, ব্রাহ্মণগায়ের চিতা মন্দির পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকলের সদিচ্ছা ও আমত্মরিকতা। সেই সংঙ্গে প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ। তবে আশার কথা ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই কালীগঞ্জে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলায় উদ্যোগী হয়েছেন্ ।  যেমন নারগানা গ্রামে ব্যক্তি উদ্যোগে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠতে যাচ্ছে।

ঐতিহাসিক ও গুরুত্বূপূর্ণ স্থানঃ

প্রাচীন জনপদের অন্তর্ভুক্ত জন বসতি এই অঞ্চলে সু প্রাচীনকাল থেকেই ছিল তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বিজিত ও বিতাড়িত লক্ষণ সেন ও তার বংশধরগন দীর্ঘ দিন  পূর্ব বঙ্গে রাজত্ব করেছিল। এ সময় অত্র অঞ্চলের অধিকাংশ জনগন ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরে বাংলা মুসলিম রাজত্ব কালে গাজীপুর অনেকগুলো চেদি রাজ্যে বিভক্ত হয়। কালীগঞ্জ ছিল স্বাধীন সামম্ত রাজ্যের রাজা থাইডা ডোসকার অধীনে। এই চেদী রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কিছু লোক পাওয়া যায় যারা চন্ডাল উপজাতি নামে পরিচিত, উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এ এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু হয়। সে সময়ে ঐতিহ্যবাহি গাজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শাহ পালোয়োন খান , আওলিয়া শাহ কারফরমা, গোলাপ শাহের ভ্রাতা সরল শাহ অত্র এলাকায় ধর্ম প্রচারে আসেন বলে প্রমান  পাওয়া যায়। ইতিহাস খ্যাত বার ভূইয়াদের অন্যতম ফজল গাজি, তিলা গাজি, ভাওয়াল রাজত্ব গড়ে তোলেন। তৎকালিন সময়ে বারভূইয়াদের অন্যতম ঈসা খান এ অঞ্চলে আসতেন বলে ইতিহাসে প্রমান  আছে।

সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কালীগঞ্জ এলাকার নাগরী এলাকায় খৃষ্টধর্ম প্রচারের সূচনা হয়। মুসলিম, হিন্দু, খ্রীষ্টান জনগোষ্ঠির বাইরে এ এলাকার কিছু আদিবাসী যেমন ডোম, সাঁওতাল, কোচ, রাজবংশী, মান্দী বা গারো সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতো।

চৌড়াঃ চৌড়ার পূর্ব নাম ছিল টেরা, অপভ্রংশ হয়ে হয়েছে চৌড়া। কালীগঞ্জের নিকটে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত চৌড়া গ্রামে ইসলাম ধর্মের প্রচারক শাহ কারপরমা (রাঃ) প্রথম আসত্মানা ফেলেন। পরে ভাওয়ালের গাজী বংশীয় শাসকরা চৌড়াকে ভাওয়ালের রাজধানী করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এখনও মাটির নিচে চাপা পড়া ধবংশাবশেষ ছাড়াও একটি বিশাল (গাজীদের নির্মিত) দীঘি রয়েছৈ, ষোড়ষ শতাব্দিতে নির্মিত মসজিদ রয়েছে দীঞির পাড়ে। এছাড়া নিতামত্ম অবহেলিত অবস্থায় পতিত দুটি প্রাচীন কবরকে পালোয়ান খাঁ গাজী ও কা্উয়ুম খাঁ গাজীর কবর হিসেবে চিহ্নি করা হয়।

বক্তারপুরঃ ধারণা করা হয়, বরকত গাজীর নামানুসারে এই গ্রামের নামকরণ করা হয়েছিল বরকতপুর। পরবর্তীকালে অপভ্রংশ হয়ে বক্তারপুর হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা পূর্বে ঈশা খাঁ এখানে অনেক বজরা নিয়ে গোপনে বসবাস করতেন। তখন নাম হয় বজ্রাপুর, তা’ থেকে বক্তারপুর। স্থানটি গাজীদের সুরম্য স্থাপনায় ছিল পরিপূর্ণ । কালের করাল গ্রাসে আজ তা ভূগর্ভে প্রোথিত। জনশ্রুতি আছে ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তাকে এখানেই সমাহিত করা হয়। ঐতিহাসিক যোতিন্দ্র মোহন রায় উল্লেখ করেছেন ‘‘ বজ্রাপুরে পিতা ঈশা খাঁর মতই পুত্র মাসুম খাঁ নানা দুযোর্গময় সময়ে আশ্রয় নিয়েছেন এবং এখান থেকেই ছিল, পরে তার ছেলে মাসুম খাঁর আমলে মোঘলসেনা শাহবাজ খাঁ ১৫৮৩ সালে ধবংশ করেন।

বালীগাঁওঃ উপজেলা সদরের সন্নিকটে বালীগাঁও গ্রামের একটি ধ্বংসস্ত্তপকে স্থানীয় জনসাধারণ বাহাদুর গাজী কর্তৃক নির্মিত মসজিদের ধবংসাবশেষ বলে মনে করেন। জানা যায়, ধবংসস্ত্তপের  নিকটবর্তী একটি বাড়িতে ধবংশপ্রাপ্ত মসজিদটির একটি শিলালিটি রক্ষিত আছে যাতে বাহাদুর গাজী কর্তৃক মসজিদ নির্মানের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ শিল্প ও কৃষি উৎপাদন কেন্দ্র।

কোষাখালীঃ কালীগঞ্জের বক্তাপুর ইউনিয়নে কোষাখালী নামক স্থানের কোষাখালী খালে ফজলগাজী ও বাহাদুর গাজীর রণতরী রাখা হত। বাহাদুর গাজীর ২০০ কোষা বা হালকা রণতরী ছিল। পোতাশ্রয় হিসাবে ব্যবহৃত এই খাল আজও বর্তমান।

নাগরীঃ উপজেলার দক্ষিণ পশ্চিম প্রামেত্ম বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত। খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত একটি ঐতিহাসিক জনগপদ যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ খ্রীস্টান মিশনারীর মর্যাাদায় আসীন। নাগরীতে ষোড়শ শতকের শেষ দিকে পুর্তগীজ খ্রীস্টানরা আসত্মানা ফেলে এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিক্রমে ১৬৬৪ সনে তারা প্রথম গীর্জা স্থাপন করেন। পরে ১৬৮০ সনে পাকা ইমারত হয় নাগরীর সেন্ট নিকোলাস টলেন্টিনো চার্চ। এখান থেকে কালীগঞ্জের আঞ্চলিক বাংলা ভাষার প্রথম বাইবেল অনুদিত হয়। সর্বপ্রথম বাংলা ভাষার দ্বিভাষিক অভিধান ও প্রথম গদ্য ছাপার বইও প্রকাশিত হয়।

তুমুলিয়াঃ কালীগঞ্জ উপজেলাধীন শীতলক্ষ্যা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। এখানে রয়েছে দেশের বিখ্যাত ১৮৪৪ খ্রীস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সাধু যোহনের চার্চ। চার্চ ভবনটি দেখতে খুবই সুন্দর।

পানজোড়াঃ উপজেলার নাগরী গ্রামের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত টিলা নিম্মভূমির সমন্বয়ে গঠিত ভূভাগের উপরিতলে প্রচুর বৃক্ষলতা রয়েছে। ১৭৮৯ খ্রীস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত পানজোড়া গ্রামের সাধু আমত্মনির গীর্জার কারণে উক্ত অঞ্চল ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে।

জামালপুরঃ কালীগঞ্জের জামালপুর বাজারটি ছিল মসলিন সংগ্রহের কেন্দ্র। পূর্বের ধারা বহন করে হিন্দু যোগী বা নাথ এবং মুসলমান তাঁতীগণ উৎকৃষ্টি মানের তোয়ালে, লুঙ্গি, ধুতি, চাঁদর ইত্যাদি তৈরি করে।

উলুখোলাঃ বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও বিখ্যাত গ্রামীণ কৃষি পণ্যের বাজার। বালু নদীর দক্ষিণ তীরে রূপগঞ্জের উত্তর সীমায় অবস্থিত। এখান থেকে উৎপাদিত কাচাঁ কৃষি পন্য বহু প্রাচীনকাল হতে শুরু হয়ে আজও দেশে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। দক্ষিণ পার্শ্বে বহুল আলোচিত পূর্বাচল উপশহর বাসত্মবায়নাধীন।

কালীগঞ্জঃ উপজেলা সদর অবস্থিত। এখানে পূর্বে মসলিন উৎপাদিত হত। শত বছরের প্রাচীন স্কুল আর আর এন (রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মসলিন কটন মিল এখানে অবস্থিত। কালীগঞ্জ ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান নীল চাষের এলাকা। ইংরেজ কুঠিয়ালদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জের নীল চাষীগণ প্রতিবাদ মুখর হয়ে বিদ্রোহ করেছিল।

এ ছাড়া ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত যীশু হৃদয়ের গীর্জার জন্য রাঙ্গামাটিয়া, ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সাধু অগাস্টিনের গীর্জার জন্য মঠবাড়ি গ্রাম ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে।

কালীগঞ্জের ঐতিহ্য

কালীগঞ্জ উপজেলা গাজীপুর জেলার মধ্যে একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। কালীগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে কালজয়ী শীতলক্ষা নদী বয়ে গেছে। বিখ্যাত মসলিন কটন মিলস, প্রান আরএফএল গ্রুপ, সেভেন সার্কেল লিঃ, আর কে জুট মিলস, ন্যাশনাল জুট মিলস, নাগরী টলেনটিনু গির্জা, তুমুলিয়া গির্জা ইত্যাদি।

প্রখ্যাত ব্যক্তি

শহীদ ময়েজ উদ্দিন বীর মুক্তিযোদ্ধা

তিনি কালীগঞ্জের গৌরব, তার জন্য আমরা সকলে গর্ভবোধ করি।

একনজরে কালীগঞ্জ উপজেলা

জেলার নামঃ গাজীপুর
ঢাকা থেকে দুরত্বঃ ৪০ কিঃ মিঃ
গাজীপুর থেকে দূরত্বঃ ২০ কিঃ মিঃ
মোট আয়তনঃ ২১৭.৫১ বর্গ কিলোমিটার
(ক) মোট জনসংখ্যাঃ ২,৩৯,৬৬০ জন, পুরুষ- ১,২২,৮৪০ জন, মহিলা- ১,১৬,৮২০ জন।
(খ) ধর্ম ভিত্তিক জনসংখ্যাঃ মুসলিম -১,৯৫,৭৬৪, হিন্দু- ২৭,৯৭০ জন, খ্রিষ্টান- ১৫,৬৯১ জন, অন্যান্য- ১৩২ জন।
(গ) মোট খানার সংখ্যা- ৪৭,৮৪১
জন্ম হারঃ ২.১৩%
শিক্ষিতের হারঃ ৫৩,২%
মোট ভোটার সংখ্যাঃ ১,৫৫,০৭০ জন, পুরুষ- ৭৮,৯৪১, মহিলা- ৭৬,১২৯ জন।
প্রশাসনিক কাঠামোগত তথ্যঃ

ইউনিয়ন থানার সংখ্যা গ্রাম মৌজা ভোট কেন্দ্র ইউনিয়ন ভূমি অফিস
০৭ ০১ ১৮৫ ১৪৬ ৭১ ০৫

 

সায়রাত সংক্রান্ত তথ্যঃ

খাস পুকুর হাট-বাজার বালু মহাল খেয়াঘাট চিনমেলা মন্তব্য
৫৩টি ২৮টি ০১টি ০৪টি ০৩টি

 

খাস ও ভিপি সম্পত্তি সম্পর্কিত তথ্যঃ

খাস সম্পত্তির পরিমান অর্পিত সম্পত্তির পরিমান মন্তব্য
১,২৫৪.৯৯ (একর) ৮৯৫.৭৯ (একর)

 

আদর্শ গ্রাম, আশ্রায়ণ ও আবাসন সংক্রান্ত তথ্যঃ

আদর্শ গ্রাম ০৩টি
আশ্রিত পরিবার ১১৭টি

 

কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়ের তথ্যঃ

কলেজ উচ্চ বিদ্যালয়
সরকারী মহিলা সহশিক্ষা মোট সরকারী বালক সরকারী বলিকা বেসরকারী বালিকা সহশিক্ষা মোট
নাই ০১ ০৪ ০৫ ০১ ০১ ০৭ ২৮ ৩৭

 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্যঃ

সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় মোট
৮৫ ২৪ ১২ ১২১

 

মাদ্রাসার তথ্যঃ

দাখিল মাদ্রাসা আলিম মাদ্রাসা ফাজিল মাদ্রাসা কামিল মাদ্রাসা মোট মন্তব্য
১৬ ০৬ ০১ ০১ ২৪

 

যোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্য (কিঃমিঃ)

পাকা রাস্তা কাঁচা রাস্তা আধা পাকা নৌপথ রেল পথ মোট
৭২ ৫৭০ ২৮ ২৫

(আনুমানিক)

১৫ ৭১০