স্মৃতিতে অমলিন আজম খান

0
700

স্মৃতিতে অমলিন আজম খান

পুরো নাম: মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান।
পপ সংগীতের প্রতীক পুরুষ আজম খান, বাংলাদেশ সংগীত জগতের ‘পপ গুরু’ হিসেবে খ্যাত আজম খান চির বিদায় নিলেন পাঁচ জুন৷ দেশজ লোকসংগীত, পল্লিগীতি, আধুনিক অথবা সমাজ সচেতন গানের সাথে পপ শৈলীর মিশ্রণ দিয়ে গানের এক বিরাট সম্ভার রেখে গেলেন তিনি৷

জন্মস্থান:

আজম খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ঢাকার আজিমপুর কলোনির ১০নং সরকারি কোয়ার্টারে। তার পুরো নাম মাহবুবুল হক খান। মা মৃত জোবেদা খানম। বাবা মৃত মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান।
বাবার পেশায় ছিলেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার, সেক্রেটারিয়েট হোম ডিপার্টমেন্ট। ব্যক্তিগতভাবে হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক ও ছিলেন।

স্কুল জীবন:

১৯৫৫ সালে প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে বেবিতে ভর্তি হন। এরপর ১৯৫৬ সালে কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাইমারিতে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন।

কলেজ জীবন:

১৯৭০ সালে স্কুল শিক্ষার পর ঢাকার টি.এন.টি কলেজ থেকে স্নাতক লাভ করেন৷ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে হাতে অস্ত্র তুলে নেন তিনি । তাই পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি। স্বাধীনতার পর অস্ত্র ফেলে কন্ঠে তুলে নেন সংগীত৷ ‘উচ্চারণ’ শিল্পী গোষ্ঠী নিয়ে সংগীত জগতে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ৷ সত্তরের প্রথমার্ধে বংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম কনসার্ট৷ তার পর থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশ জুড়ে৷ ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা পপ সংগীতের এক প্রতীক পুরুষ৷

১৯৮১ সালে ১৪ জানুয়ারি, সাহেদা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় আজম খানের। তখন তার বয়স ছিল ৩১ বছর। সহধর্মিণী মারা যাওয়ার পর থেকে একাকী জীবন কাটান তিনি। আজম খান দুই মেয়ে এবং এক ছেলের জনক। প্রথম সন্তান ইমা খান, নাতনি কায়নাত ফাইরুজ বিনতে হাসান।

দ্বিতীয় সন্তান: হূদয় খান।
তৃতীয় সন্তান: অরণী খান।
বর্তমান ঠিকানা: ২ নম্বর কবি জসীমউদ্দীন রোড, কমলাপুর, ঢাকা-১২১৭।
বড় ভাই: সাইদ খান, পেশা সরকারি চাকরিজীবী।
মেজো ভাই: আলম খান, পেশা গীতিকার ও সুরকার।
ছোট ভাই: লিয়াকত আলী খান (মুক্তিযোদ্ধা) পেশা ব্যবসায়ী।
ছোট বোন: শামীমা আক্তার খানম।

খুব সহজ সরল জীবন যাপন করতেন তিনি৷ যদিও ১৭ টিরও বেশি হিট গানের অ্যালবাম বেরিয়েছে বাজারে৷ কয়েক মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে৷ কিন্তু কপিরাইটের কারচুপির কারণে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা তাঁর ছিল না৷ আর এই টাকার অভাবেই সিঙ্গাপুরে ক্যান্সারের চিকিৎসা হতে পারেনি৷ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দুরারোগ্য ব্যাধির সংগে লড়াই করে অবশেষে পাঁচ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা পপ সংগীতের এক পথ প্রদর্শক আজম খান৷

আজম খানের উল্লেখযোগ্য গান

আজম খান ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক৷ বাংলাদেশে পপ সংগীতের অন্যতম পথপ্রদর্শক৷ তাঁর চটুল পপ আঙ্গিকের সংগীত বাংলাদেশের যুব সমাজের কাছে পেয়েছে বিপুল সমাদর৷ শুধু বাংলাদেশেই নয় গোটা উপ মহাদেশেও আজম খান পেয়েছেন অসাধারণ জনপ্রিয়তা৷

বিশ্বের বেশ ক’টি দেশে কনসার্ট পরিবেশন করেন আজম খান৷ এসব কনসার্টে শুধু প্রবাসী বাঙালিই নয় বহু বিদেশী সংগীতানূরাগীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি৷ বাংলা সংগীতের নানা ধারার গান পপ আঙ্গিকে গেয়েছেন আজম৷

গলির মোড়ের সিডির দোকানেও ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’র জায়গায় চলে এসেছে অনেক নতুন নতুন গান। কিন্তু সময়ের স্রোতে এখনো মাঝে মাঝে কোনো কোনো মুঠোফোনে বেজে উঠে আজম খানের বিখ্যাত গান ‘রেল লাইনের ঐ বস্তিতে’। আজম খান ১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ শিরোনামে গান গেয়ে হইচই ফেলে দেন। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আমি যারে চাইরে’, ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘একসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি।

পেশা: সংগীতশিল্পী

বিশেষত্ব: দেশপ্রেমিক ও মানবদরদি, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা পপসংগীতের জনক।

উপাধি: পপসম্রাট আজম খান, কিংবদন্তি আজম খান, গুরু নামে খ্যাত।

ক্রিকেটার আজম খান

খেলাধুলায়ও ব্যাপক আগ্রহ ছিলো আজম খানের। ক্রিকেটার হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এ পপ তারকা। গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন। ৯ বছরে অনেকগুলো ক্রিকেট ম্যাচে নিজের খেলোয়ার প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

বিদায়বেলায় পপ-গুরু

মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আজম খান। দেশে-বিদেশে অনেক চিকিৎসার পরও তাকে ফেরানো যায়নি। অসাধারণ কণ্ঠের এক সংগীত জাদুকরের জীবন থেমে যায় ৬১ বছর বয়সে ২০১১ সালে ৫ জুন। আজম খান নেই, আছে তার তুমুল জনপ্রিয় সব গান। গানের মধ্য দিয়েই পপসম্রাট আজম খান অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন আজীবন।