দুই শহরের আরেক গল্প – পলিন

0
255

দুই শহরের আরেক গল্প!

তার সাথে আমার দেখা ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। যদিও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে নিয়ম হলো ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের কমপক্ষে ৩ ঘন্টা আগে বিমানবন্দরে রিপোর্ট করতে হয়- এটা এতো কড়াকড়ি ভাবে মানা হয় না। তবে আমি তাই করেছিলাম। আমার ফ্লাইট ৪ টা ২৫ মিনিটে। ৩ ঘন্টা আগে বিমানবন্দরে পৌছে চেক-ইন, ইমিগ্রেশনসহ সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে মাত্র অল্প কিছুক্ষণ সময় ব্যয় হলো। তারপর অন্য যাত্রীদের সাথে আমার গন্তব্য ডিপারচার লাউঞ্জ। হাতে শুধু পাসপোর্ট আর বিমানের বোর্ডিং পাশ। সেখান থেকে বিমানের উঠানামা, বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মব্যস্ততাসহ সব দেখা যায়।

দুই শহরের আরেক গল্প

চেক-ইনের সময় বেল্ট খুলে সেটা সমস্ত ব্যাগ ও মোবাইলসহ এক্সরে স্ক্যানিংয়ের জন্য পাঠাতে হয়। আমি ডিপারচার লাউঞ্জের একটা সিটের পাশে দাড়িয়ে বেল্ট পড়ছিলাম। আর ইস্ট চায়না, এয়ার ইন্ডিয়া, মালিন্দ, জেট এয়ারওয়েজ, ইতিহাদ এয়ারওয়েজের বিশাল বিশাল বিমানগুলো কিভাবে উড্ডয়ন করে আর অবতরণ করে সেটা দেখছিলাম। আর তার সাথে সাথে নেপালের আভ্যন্তরীণ কিছু এয়ারলাইন্স যেমন বুদ্ধ এয়ার, ইয়েতি এয়ারলাইন্স ও গোর্খা এয়ারলাইন্সের কয়েকটি ছোট বিমানও চোখে পড়ছিল। মাঝে মাঝেই এয়ারলাইন্স কোম্পানির এসি বাসগুলো ছুটে যাচ্ছিল যাত্রীদের নিয়ে বিমানের দিকে কিংবা বিমান থেকে যাত্রীদের নিয়ে এরাইভাল লাউঞ্জের দিকে। লাগেজ বহনকারী ট্রলীগুলো ছুটে বেড়াচ্ছিল রানওয়ের সর্বত্র। এখানে সাধারণত একজন যাত্রী আরেকজন অপরিচিত যাত্রীর সাথে কথা বলে না। কিন্তু আমি দেখলাম আমার সাথে বসে থাকা লোকটি আমাকে লক্ষ্য করছে। আসলে তাকে ছেলে বলবো নাকি যুবক বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না, তাই ‘লোক’ বললাম। সাধারণত নেপালীদের গায়ের রং বাঙালীদের থেকে উজ্জ্বল। কিন্তু আমার মনে সেই লোকটিকে নেপালীদের মধ্যেও আরো সুদর্শন বলতে হবে। সিটে বসার পর উনার সাথে আমার প্রায় দেড় ঘন্টার একটি বড় কথোপকথন হলো। সেই কথোপকথনটি আমি তুলে ধরছি-

লোকটিঃ ভাই, আপনার গন্তব্য?
আমিঃ ঢাকা, বাংলাদেশ। আপনার?
লোকটিঃ ইউএসএ। তারমানে আপনি এসে এদেশ ঘুরে এখন ফিরছেন। তাইনা? আপনার নাম?
আমিঃ রাহাত। আপনার?
লোকটিঃ সামীর শ্রেষ্ঠ। তো, কোথায় কোথায় ঘুরলেন?
আমিঃ কাঠমুন্ডু, পোখারা, নগরকোট, সারংকোট, ললিতপুর আর গোর্খা।

সামীরঃ জমসম জাননি? এটাতো খুব সুন্দর জায়গা।
আমিঃ ভাই, যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অনেক দূরে হওয়ার কারণে মাত্র ৮ দিনের এই সফরে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
সামীরঃ আরো কোন জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কি?
আমিঃ হ্যা। লুম্বিনি যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। আরেকবার আসতে হবে নেপালে শুধুমাত্র জমসম আর লুম্বিনি যাওয়ার টার্গেট নিয়ে।

সামীরঃ আপনি কি হিন্দু?
আমিঃ না ভাই। আমি মুসলিম। আপনি কি হিন্দু?
সামীরঃ হ্যা। আমার নামটা মুসলিম টাইপের হলেও আমি হিন্দু।
আমিঃ আপনি কি ইউএসএতে থাকেন নাকি ঘুরতে যাচ্ছেন?

সামীরঃ না। আমি বহু বছর ধরে স্ট্যাটসেই থাকি।
আমিঃ জন্মস্থান কি নেপালে?
সামীরঃ হ্যা। এই নেপালের পোখারা শহরেই আমার জন্ম।
আমিঃ তাহলে স্ট্যাটসে কি পড়াশোনার উদ্দেশ্যেই প্রথমে যাওয়া?

সামীরঃ ভাই, সেটা অনেক বড় এক কাহিনী। (ঘড়ি দেখে) সময়ওতো অনেক আছে। শুনবেন কাহিনীটি?
আমিঃ অবশ্যই। কেন নয়?
সামীরঃ আমার বাবা মা কেউ নেই। কাউকে আমি দেখিনি। জ্ঞান হওয়ার পর নিজেকে আবিস্কার করেছিলাম পোখারা শহরের একটি অরফানেজে (এতিমখানায়)। সেখানের কড়া গন্ডির মাঝেই কাটতে থাকে আমার ছেলেবেলা। বন্ধু বলতে শুধু একজন ছিল- জুলিয়ানা। একইসাথে একই এতিমখানায় বেড়ে উঠা। মাঝে মাঝে দুজন একসাথে ঘুরে বেড়াতাম পোখারা শহরের পথে পথে।

ভাই, আপনার কি গার্লফ্রেন্ড আছে?
আমিঃ না, নেই। তারপর?
সামীরঃ সেই ছোটবেলায় একসাথে বড় হয়েছি বলে দুজনের মাঝে ছিল এক আত্মীক সম্পর্ক। তারপর একদিন আমাদের অরফানেজে এলেন এক আমেরিকান মহিলা।

আমিঃ তারপর তিনিই কি আপনাকে আমেরিকাতে নিয়ে গেলেন?
সামীরঃ আরে শোনই না। তারপর তিনি আমাদের ওখানে অনেকদিন ছিলেন। কি কারণে জানিনা, আমাকে উনার খুব ভালো লেগে গেলো। হয়তোবা আমার চেহারার জন্যই।
(আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম এবং মাঝে মাঝে শুধু কথোপকথন ঠিক রাখার জন্য তারপর তারপর বলে যাচ্ছিলাম। উনার বলাটাও এতো সাবলীল ছিল যে, আমার বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হচ্ছিলো না।)
আমিঃ তারপর কি হলো?
সামীরঃ একদিন ঐ মহিলাটি বললেন যে, তার শেষ সময় সমাগত। তিনি বহু বছর ধরে খুব জটিল কোন রোগে আক্রান্ত। তার আর বেশিদিন সময় নেই। আর তিনি যখন এই রোগের কথা জানতে পেরেছিলেন তখন থেকেই তিনি জীবনের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ব্যয় করে নানা দেশ ঘুরে এতিমদের জন্য কাজ করছেন। এরপর ইন্ডিয়াতে যাবেন এবং এভাবেই কোন এক স্থানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। এখন আমাকে এখানে রেখে যেতে তার মন চাচ্ছে না। কারণ এই অরফানেজে  তেমন ভালো কিছু শিক্ষা দেয়া হয় না।

আমিঃ তারপর তিনি কি করলেন?
সামীরঃ তিনি বললেন কাঠমুন্ডু শহরে তার পরিচিত খুব ভালো একটা অরফানেজ আছে সেখানে ভালো শিক্ষাও দেয়া হয়। তিনি আমাকে ওখানে রেখে যাবেন। কিন্তু আমি তার কথায় প্রথমে রাজি হইনি।
আমিঃ কেন?
সামীরঃ আমি জুলিয়ানাকে ওখানে রেখে আসতে চাইনি।
আমিঃ তাহলে কি আপনার কাঠমুন্ডুতে আসা হয়নি?
সামীরঃ না, হয়েছিল। আর এটাই আমার জীবনটা বদলে দিয়েছিল। আমার কথা শুনে আমাদের দূজনকেই তিনি কাঠমুন্ডুতে নিয়ে আসেন। আসলেই নতুন অরফানেজ আগেরটা থেকে অনেক ভালো ছিল। এখানে আমরা নেপালী ভাষার সাথে ইংরেজি শিখতে থাকি। বছর দেড়েক পরে ঘটে আরেকটি ঘটনা।
আমিঃ কি ঘটনা সেটা?

সামীরঃ আমরা কাঠমুন্ডুর যে এলাকাতে থাকতাম, সেদিক দিয়ে শুরু হয় গ্যাসের পাইপ নেয়ার কাজ। অনেক আমেরিকানরা আসেন। আমিও অবসর সময়ে সেখানে চলে যেতাম। বিদেশীদের কাজে সাহায্য করলে তারা মাঝে মাঝে রুপি দুয়েক উপহার দিতো যা দিয়ে আমি চকলেট ও ফলমূল কিনে খেতাম। তাছাড়া তারা খুব সুন্দর কিছু পানির বোতল উপহার দিতো ছোটদেরকে। এসবের লোভে আমরা প্রায়ই অবসর সময়ে ঐখানে যেতাম।
আমিঃ তারপর?
সামীরঃ সেখানের ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝে একজন ছিলেন মিঃ ও হেনরী। আমি আসলে মেধাবী ছিলাম। আর তাই অরফানেজের ছাত্রদের মাঝে আমিই সবচেয়ে ভাল ইংরেজি জানতাম। আমাকে মিঃ হেনরী খুব পছন্দ করে ফেলেন। তিনি প্রায়ই আমাকে নানা উপহার দিতেন।

আমিঃ তারপর তিনিই কি আপনাকে আমেরিকায় নিয়ে যান।
সামীরঃ হ্যা। আমেরিকাতে উনার স্ত্রী আছেন। তবে তারা নিঃসন্তান। তিনিই আমাকে দত্তক নিতে চাইলেন।
আমিঃ এবার আপনি জুলিয়ানাকে ছেড়ে যেতে আপত্তি করেননি?
সামীরঃ এবারে আমার আর কিছুই করার ছিল না। কারণ ওই ছোট বয়সেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম এটা আমার জন্য একটা সুযোগ। এদেশে থাকলে আমার ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হবে না। তাছাড়া একটা পরিবারে বড় হবো, ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবো, ৩ বেলা ভালো খাবার পাবো, বাবা মায়ের আদর পাবো তারচেয়ে ভালো আর কি হতে পারে?
আর তাই আমাকে তখন স্বার্থপর হতে হয়েছিল। তখন আমি জুলিয়ানার কথা বলিনি, যদি তাতে আমার পালক বাবা তার মত চেঞ্জ করে?
আমিঃ তারপর?

সামীরঃ তারপর কাহিনী খুব ছোট। তিনি আমাকে দত্তক নিয়ে নিলেন। তার আন্তরিকতায় কিছুদিনের মাঝে ভিসা-পাসপোর্টও তৈরী হয়ে গেলো। আর আমি পাড়ি জমালাম আমেরিকাতে। হ্যানরী পরিবারের ছেলে হিসেবেই বেড়ে উঠলাম। তবে তারা আমার নাম পরিবর্তন করেননি। কেন জানিনা। তারপর স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াও সেখানে ভালোভাবে শেষ করলাম। এখন খুব ভালো চাকরী করছি। ৬-৭ বছর হলো আমেরিকাতে বিয়েও করেছি। তবে এখনো কোন সন্তান হয়নি।
আমিঃ জুলিয়ানার সাথে যাওয়ার আগে আর দেখা হয়নি?
সামীরঃ হয়েছিল। মনে পড়ে শেষ বিদায়ের সময় তাকে বলেছিলাম- যাইরে। সে তখন কিছুই বলেনি। শুধু চেয়েছিল। তার চোখে ছিল জল।
আমিঃ তারপর আর নেপালে আসেননি?
সামীরঃ এইবারেই প্রথম। মাঝখানে আর আসা হয়নি। ৯-১০ বছর বয়সে দেশ ছেড়ে গিয়েছি। আবার ৩০ বছর পরে আসলাম, স্ত্রীকে নিয়ে, একমাসের জন্য। স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। আবার ঘুরে গেলাম নিজের পরিচিত জায়গাগুলোতে। চেনা-জানা দুই শহরে। আজ আবার চলে যাচ্ছি।

আমিঃ দেশের জন্য খারাপ লাগেনি এতোদিন?
সামীরঃ প্রথমদিকে খুব খারাপ লাগতো জুলিয়ানার জন্য, দেশের জন্য। তারপর আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
আমিঃ এবারে এসে জুলিয়ানাকে খুজেননি?
সামীরঃ আমি আর আমার স্ত্রী মিলে অনেক খুজেছি। কাঠমুন্ডুর ওই অরফানেজে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বন্ধুকে পেলাম। সে বলল যে, আমাকে ছাড়া তার এ শহরে মোটেও ভালো লাগছিল না। তাই সে কতৃপক্ষের হাতে-পায়ে ধরে চলে যায় পোখারা শহরের অন্য একটা অরফানেজে। শোনার পরে আমরাও পোখারাতে গিয়ে আমরা তাকে পোখারাতে গিয়ে অনেক খুঁজি। একসময় আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম যে তার দেখা পাবো।

আমিঃ দেখা পাননি?
সামীরঃ অনেক খুজে শেষ পর্যন্ত তাকে আমরা পেয়েছিলাম। তার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েও হয়েছে।  আমাদের তার স্বামীর সাথেও দেখা হয়েছে। তাদের অবস্থা এতো ভালো নয়। আমি তাদের সাহায্য করতে চেয়েছি কিন্তু আমার কোন সাহায্যই তারা নিতে রাজি হয়নি। তবে এতো বছর পরেও জুলিয়ানা আমাকে দেখামাত্রই চিনতে পেরেছে। বিদায়ের দিনে যেমন তার চোখে জল ছিল, সেদিনও তার চোখে ছিল জল। যেদিন আমরা পোখারা ছেড়ে চলে আসবো, সেদিনও সে আর তার স্বামী এসেছিলো আমদের বিদায় জানাতে। সেদিনও জুলিয়ানার চোখে দেখেছি জল।
আমিঃ আপনার স্ত্রী তাহলে আপনার অতীত সম্পর্কে সব জানে?
সামীরঃ হ্যা। সব জেনেই সে আমাকে বিয়ে করেছে। ওহ মাই গড, সে এখনো ডিপারচার লাউঞ্জে আসেনি। কে জানে ভেতরে সে কি করছে। মনে হয় ডিউটি ফ্রি শপে বসে ড্রিংকস করছে। আমি তাকে নিয়ে আসি। বলে যে সিট থেকে উঠে গেলো। যাওয়ার আগে সে বলে গেলো, ভাই আমি আমার অতীতের কথা খুব বেশী মানুষকে বলিনি। আপনাকে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে তাই বললাম।

আরো হয়তো অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিলো। কিন্তু আর কোন কথা বলার সুযোগ হলো না। তবে আমার ফ্লাইটের আগে ছিলো ওদের ফ্লাইট। একটু পরেই ইউএসএ’র যাত্রীদের প্লেনে বোর্ড করতে বলা হলো। সামীর আর তার স্ত্রীকে আসতে দেখলাম। সামীর আমাকে টাটা দিয়ে চলে গেলো।
তবে আমারতো নামটা জানা ছিল- সামীর শ্রেষ্ঠ, ঢাকায় পৌছে প্রথমেই আমি এটা লিখেই ফেসবুকে সার্চ দিলাম, এবং তার আইডিটা পেয়েও গেলাম। ইংরেজি কাব্যছন্দে তার সর্বশেষ স্ট্যাটাস যেটা ছিল সেটা বাংলাতে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়-

“কয়েকদিন আগে পোখারা ছেড়ে চলে এসেছি, আজ ছেড়ে যাচ্ছি কাঠমুন্ডু,
ছেলেবেলার ভালবাসা পড়ে রইল একসময়ের চেনা শহরদুটির অলিতে-গলিতে,

শেষ হলো দুই শহরের গল্প।”
রাহাত মাহমুদ পলিন